
বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কারণে,দেশের সরকারি,আধা সরকারি,স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি মরণব্যাধি ক্যান্সার এর রূপ ধারণ করেছিল।বিগত সরকারের সময়ে জন্ম নেওয়া মহা দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী,এমপি,আমলা,শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির মূল হোতা সালমান এফ রহমান,ব্যাংক কেলেঙ্কারির হোতা এস আলম গ্রুপ এর মালিক শামসুল আলম,ছাগল কাণ্ডে আলোচিত এনবিআর এর সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমান,বন খেকো মোশারফ,বিসিএস প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারির হোতা আবেদ আলী,পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদ,সিআইডি সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া গংদের অনিয়ম দুর্নীতির ফিরিস্তি একে একে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে আসার পর এইবার বেরিয়ে আসলো আরেক মহা দুর্নীতিবাজ বর্তমানে চাঁদপুর নৌ পুলিশ পরিদর্শক মোজাম্মেল হকের নাম।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ৫ আগস্ট ২০২৪। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিন। দাউদকান্দি থানার ভেতরে টানটান উত্তেজনা। বাইরে হাজারো ছাত্র-জনতা, ভেতরে গুলির শব্দ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন—সেই গুলির নেতৃত্বে ছিলেন থানার ওসি মোজাম্মেল হক। আন্দোলনকারীরা ঝরে পড়ছিলেন রক্তে ভিজে, আর কয়েক ঘণ্টা পরই সরকারের পতন ঘটে।
কিন্তু মোজাম্মেল হক? তিনি গায়েব হয়ে গেলেন থানার পেছনের দরজা দিয়ে। গায়ে ছিল শুধু লুঙ্গি আর গেঞ্জি। জনতার ধাওয়া খেয়ে পালানোর সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন—এবার হয়তো বিচারের মুখোমুখি হবেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে আছেন চাঁদপুর নৌপুলিশে।
সুচতুর পুলিশ পরিদর্শক মোজাম্মেল হক।মোজাম্মেল হক থাকা এস আই পদে থাকাকালীন দীর্ঘ সময় চট্টগ্রাম জেলার ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা হিসেবে খ্যাত সীতাকুণ্ড মডেল থানার চাকরির সুবাদে সীতাকুন্ড এলাকায় গড়ে তুলেল নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট।পরবর্তীতে ধীরে ধীরে পদোন্নতি নিয়ে ওসি তদন্ত পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ের মাধ্যমে আবারও চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড মডেল থানায় বদলি হয়ে যান।
মোজাম্মেল হকের নাম নতুন নয়। সীতাকুণ্ডে দায়িত্ব পালনকালে শিপইয়ার্ড ও শিল্প কারখানায় তার চাঁদাবাজির খবর স্থানীয়রা মুখে মুখে বলে আসছেন। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন—প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো “ওসি সিন্ডিকেটে”। মহা দুর্নীতিবাজ মোজাম্মেল হক সীতাকুন্ড মডেল থানায় ওসি তদন্ত পদে থাকাকালীন একই থানার আরেক মহা দুর্নীতিবাজ ওসি ইফতেখার এর সাথে মিলে গড়ে তুলেন সীতাকুণ্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় নজিরবিহীন অনিয়ম দুর্নীতির সিন্ডিকেট।।
সেই টাকা কোথায় গেল? অনুসন্ধানে বেরিয়েছে,স মোজাম্মেল হক সীতাকুণ্ড মডেল থানা এলাকায় ওসি তদন্ত হিসেবে থাকার সময় নজিরবিহীন অনিয়ম দুর্নীতির টাকায় ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে গড়ে তোলেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের স্ত্রী ফাতেমার নামে সাততলা অট্টালিকা—‘ফাতেমা ভিলা’। এছাড়া ঢাকায় একাধিক প্লট, ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র, ব্রাহ্মণবাড়িয়ারবাঞ্ছারামপুর থানার বাহাদুরপুর গ্রামে রয়েছে নামে বেনামে অঢেল সম্পত্তি। পুলিশ কর্মকর্তা হলেও মোজাম্মেল হক আজ কয়েক শত কোটি টাকার মালিক।
তার ব্যক্তিজীবনও বিতর্কে ভরা। খাগড়াছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফাতেমার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে শেষমেশ স্থানীয় বাসিন্দারা তার আপন বড় ভাই সাইদুল হক সাচ্চুকে খবর পাঠিয়ে খাগড়াছড়ি নিয়ে যান ।পরবর্তীতে বড় ভাই সাচ্চু’র উপস্থিতিতে খাগড়াছড়ির স্থানীয় বাসিন্দারা সহকারী স্কুল শিক্ষিকা ফাতেমাকে মোজাম্মেল হক’র সাথে বিয়ে পড়িয়ে দেয়। চার কন্যা সন্তানের পিতা এই কর্মকর্তা এখন প্রায় সব সম্পদই স্ত্রীর নামে লুকিয়ে রেখেছেন।নিজের ব্যবহারের জন্য রয়েছে ওসি মোজাম্মেল হক’র ৩৫ লক্ষ টাকা দামের গাড়ি।
চাঁদপুর নৌ পুলিশে পদায়নের পর থেকে ওসি মোজাম্মেল হক অতীতের ন্যায় নৌপথে চলাচল করা ছোট-বড় নৌযান বালুবাহী ট্রলার গুলো থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদাবাজি করার অভিযোগ রয়েছে।চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন ঘাটে মাছ ধরা জেলেদের সাথে কথা বলে আরও জানা যায় চাঁদপুর নৌ পুলিশ এর ওসি মোজাম্মেল হক মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে সরকার নির্ধারিত প্রজনন মৌসুম ও জাটকা ধরার বিরুদ্ধে নিষেধাজারীর সময়কালে জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ করে দেন বলে জানান স্থানীয় জেলেরা।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে চাঁদপুর নৌ পুলিশের এসপির সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। মোজাম্মেল হক নিজেও ফোনে সাড়া দেননি। তবে দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলে তদন্ত শুরু করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—
একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি ছাত্র আন্দোলনে রক্ত ঝরানোর অভিযোগে অভিযুক্ত, যিনি শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক, তিনি এখনো কীভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে বহাল থাকতে পারেন?
চলবে…
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :