রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার অফিস : মারলে ‘চাঁদির জুতা’ অফিসের ত্রিরত্নের কাছে এখনও সকল কিছুই হয়


স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৯, ২০২৫, ২:৩৩ অপরাহ্ন /
রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার অফিস : মারলে ‘চাঁদির জুতা’ অফিসের ত্রিরত্নের কাছে এখনও সকল কিছুই হয়
“স্বৈরাচারী হাসিনার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তার ক্যাশিয়ারখ্যাত সাবিকুন্নাহারের সাথে হাস্যোজ্জল ফটোসেশানে (গোল চিহ্নিত) শেখ কাওসার আহমেদ”

এক সময় চাঁদি বা রুপার মুদ্রা চালু ছিল। সেই মুদ্রার বিনিময়ে কার্য হাসিলকে ‘চাঁদির জুতা’ মেরে দেওয়া বলে বাংলা প্রবচন চালু হয়েছিল। এখনও সেই ‘চাঁদির জুতা’ মারার রীতিই রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে মোক্ষম দাওয়াই হিসেবে বিবেচিত।

রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে জেলা -রেজিস্ট্রার শেখ কাউছার আহমেদ ও অফিস সহকারী শাকিল আহমেদ ও অফিস সহায়ক আশরাফ আলীর বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, কাউছার আহমেদ জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে রাজবাড়ীতে যোগদান করার এক সপ্তা পর থেকেই এখানে গজিয়ে ওঠে ঘুষ দূর্নীতি ও জাল দলিল বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের হাতে এখন গোটা রাজবাড়ী জেলা জিম্মি। এই সিন্ডিকেটে সরাসরি যুক্ত আছেন অফিস সহকারী শাকিল আহম্মেদ, অফিস সহায়ক আশ্রাফ আলী, কতিপয় দলিল লেখক ও স্থানীয় অসাধু অর্থলোভী কয়েকজন কথিত রাজনৈতিক নেতা।

এই সিন্ডিকেট প্রতিদিন দলিল সম্পাদনের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এদের হাতে দলিল দাতা ও গ্রহীতারা শতভাগ জিম্মি। এখানে ঘুষ ছাড়া মিলেনা সেবা, নড়েনা ফাইল। আর এই সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও শেখ হাসিনার পেতাত্মা জেলা রেজিস্ট্রার শেখ কাউছার আহমেদ।

সূত্র জানায়, রাজবাড়ী জেলা -রেজিস্ট্রার শেখ কাউছার আহমেদ এর নেতৃত্বে অফিস সহকারী শাকিল আহমেদ, অফিস সহায়ক আশরাফ আলী, কতিপয় দলিল লেখক ও কথিত রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট।

রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে ডিআর এর চাহিদা মোতাবেক ঘুষ না দিলে দলিল সম্পাদন সম্ভব নয়—এমন অভিযোগ করছেন দলিল গ্রহীতা ও দাতারা। বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করে দফায় দফায় আদায় করা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। এমনকি একই জমির একাধিক জাল দলিলও তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগীরা।

রাজবাড়ী জেলা -রেজিস্ট্রার শেখ কাউছার আহমেদ এর আগে সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ বন্দর সাব রেজিস্টার অফিসে সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীনও দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় বন্দর সাব রেজিস্ট্রার অফিস। বন্দর থেকে তিনি হাতিয়ে নেন অর্ধশত কোটি টাকা। এ সময় সাব রেজিস্ট্রার শেখ কাউছার আহমেদ এর নামে আইন মন্ত্রণালয়, আইজিআর অফিস ও দুদকে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়। কিন্তু অবৈধ কালো টাকার জোরে তিনি সেসব অভিযোগ থেকে নিজেকে ” দুধে ধোওয়া তুলশী পাতা “ প্রমাণে শতভাগ সফল হন।

এরপর পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রিয়জন হিসেবে খ্যাত জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন্নাহারের  নেটওয়ার্কে নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার ও আইজিআর অফিসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি সাব রেজিস্ট্রার থেকে পদন্নোতি নিয়ে হয়ে যান জেলা রেজিস্ট্রার। নিবন্ধন অধিদপ্তরের পদন্নোতি ও বদলি আদেশে কাউছার আহমেদ কে রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন করা হয়।

এর আগে বন্দর সাব রেজিস্ট্রার থাকাকালীন সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের জন্য শেখ হাসিনার নিকট আত্মীয় শেখ কাউছার আহমেদ দফায় দফায় নারায়ণগঞ্জের গডফাদার শামিম ওসমান ও তার ক্যাডার বাহিনীর গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতেন। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার মানসে কাউছার কতিপয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডারদের হাতে রাতের আঁধারে কোটি টাকা তুলে দেন বলেও বন্দর এলাকায় জোর গুঞ্জন রয়েছে। সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার ও শেখ হাসিনার নিকট আত্মীয় হিসেবে পরিচিত শেখ কাউছার আহমেদ এর কঠিন শাস্তি হওয়ার কথা থাকলেও, তার ওই ৫ কোটি ব্লাক মানির সৌজন্যে রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার পদবী বাগিয়ে নিয়ে শেখ কাউছার আহমেদ রাতারাতি নিজেকে দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

বর্তমানে রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার শেখ কাউছার আহমেদ শতশত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক। নামে বেনামে গাড়ি বাড়ি, প্লট ফ্লাট ছাড়াও রয়েছে শতকোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ।

এদিকে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে খ্যাত অফিস সহকারী শাকিল আহমেদও বর্তমানে অর্ধশত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক। বাড়ি সহ —সব মিলিয়ে ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হলেও শাকিল একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী। তার এই অবৈধ সম্পদের পাহাড় অর্জনের পিছনে শেখ কাউছার আহমেদ ছাড়াও বেশ কয়েকজন জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব রেজিস্ট্রারদের গোপন জাল দলিল বাণিজ্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানিয়েছে, সাবেক জেলা রেজিস্ট্রারদের ম্যানেজ করে অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বহাল তবিয়তে দুর্নীতির রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন অফিস সহকারী শাকিল আহমেদ ও অফিস সহায়ক আশরাফ আলী । সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কমিশনভিত্তিক দলিল তৈরি, নামজারি ছাড়া জমি রেজিস্ট্রি, খাজনার কাগজ ছাড়াই ভুয়া দলিল প্রস্তুত, ভলিউম চুরি, মুল দলিল থেকে মূল মালিকের ছবি ফেলে দিয়ে জাল দলিল প্রস্তুত, ফ্রেশ জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে ডোবানালা ও পরিত্যক্ত দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ডেভলোপার কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করে নিজেরা হয়েছেন টাকার কুমির

স্থানীয়দের ভাষায়, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস যেন এখন এক প্রকার ‘ঘুষের বাজার’। এই সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদের এসব অবৈধ সম্পদের খোঁজ তল্লাশি নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর এনফোর্সমেন্ট টিম, নিবন্ধন অধিদপ্তর ও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মহোদয় এর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন এলাকাবাসী।।

You cannot copy content of this page