“সই দিতে ঘুষ, নথি পেতে হয়রানি: নরসিংদীর ২ সাব-রেজিস্ট্রার হাসিনার প্রেতাত্মার বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগের পাহাড় ” দুদুক তদন্ত দাবি


স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশের সময় : জুলাই ২২, ২০২৫, ৬:৩২ পূর্বাহ্ন /
“সই দিতে ঘুষ, নথি পেতে হয়রানি: নরসিংদীর ২ সাব-রেজিস্ট্রার হাসিনার প্রেতাত্মার বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগের পাহাড় ” দুদুক তদন্ত দাবি

নরসিংদী জেলার সাব রেজিস্ট্রার অফিস যেনো অনিয়ম-দূর্নীতি, টেম্পারিংজালিয়াতি ও ঘুষবাণিজ্যর হেরেম খানায় পরিনত করেছে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ২ প্রেতাত্মা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী সাব রেজিস্ট্রার সোহরাব হোসেন সরকার ও গোবিন্দ সাহা।

সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভবনের ইটেও টাকা চায়। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। যাঁরা আসেন তাঁরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই আসেন। এখানে ফেরেশতা আসলেও টাকা দিতে হবে।’ ক্ষোভের সঙ্গে এসব কথা বলছিলেন নরসিংদী জেলাধীন সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা মনির হোসেন। তিনি জানান, তাঁর শ্বশুর মঞ্জুরুল ইসলাম তিন মেয়ের নামে   সাড়ে চার ডিসিম জমি লিখে দেবেন। নিষ্কণ্টক জমি, তারপরও সাব-রেজিস্ট্রারের জন্য আলাদা করে ১০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার সোহরাব হোসেন সরকার।

সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, জমির ক্রেতা-বিক্রেতা, দলিল লেখক আর দালালের প্রচণ্ড ভিড় ভেতরে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দালালেরা নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে সহজেই জমি নিবন্ধনের কাজ করিয়ে দেন। কাগজপত্রে সমস্যা থাকলেও ঠিকমতো যাচাই করা হয় না। আর দালাল ছাড়া গেলে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় সদর উপজেলার সাব- রেজিস্ট্রার অফিসে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালের উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে দলিল লেখক ও দালাল চক্ররা তাদের অপকর্ম প্রকাশ্যে চালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নিরব দর্শকের ভূমিকায়। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণে সদর উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার অফিসের কার্যক্রম।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, এ ধরনের অনিয়ম জালিয়াতির হোতা সাব রেজিস্ট্রার সোহরাব হোসেনের সিন্ডিকেটভুক্ত সদর টিসি মোহরা ও অফিস সহকারী মাহবুবের মাধ্যমে দাতা গ্রহীতারা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলিল সম্পাদন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জমির মূল জমা খারিজ খতিয়ান  সাব রেজিঃ অফিসারের নিকট প্রদর্শন করার কথা থাকলেও তা না দেখিয়ে টাকার জালে আবদ্ধ করে রাখে। রেজিঃ দলিল সম্পাদন করার সময় দাতা এবং গ্রহীতা উভয় পক্ষের উপস্থিত থাকার সরকারি নিয়ম থাকলেও উক্ত সিন্ডিকেটের কারণে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কোন এক পক্ষ উপস্থিত না হলেও দলিল সম্পাদনের কাজ সম্পন্ন করিয়ে দেয়।

 অনেক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিয়মিত সাব রেজিস্ট্রার অফিসে না থাকার দরুন সাহেবের ইচ্ছামত অফিসে এসে রেজিস্ট্রার কবলা সম্পাদন করেন। একজন গ্রাহক থেকে দলিল মূল্যের ১ থেকে ২ পার্সেন্ট  টাকা করে দলিল লেখক এর মাধ্যমে  সমিতিসহ অফিস খরচ এবং জেলা রেজিস্ট্রারের কমিশনের নামে আদায় করে নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে ।

জানা যায়, সরকারি নীতিমালার আলোকে ১ লক্ষ টাকার রেজিঃ মূল্যে সরকারি রাজস্ব আসে সর্বসাকুল্যে প্রায় ১১ হাজার টাকা। অথচ তারা এক্ষেত্রে  লোকজন থেকে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের আচরনে মনে নয় মনেহয় এ রাজ্যের রাজা তারা-ই বাকীরা সবাই প্রজা!

সচেতন মহল মনেকরে সদর উপজেলা ও পৌরসভার লোকজন দলিল লেখক ও দালাল চক্রের হাতে জিম্মী হয়ে আছে। জনসাধারণ সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট উক্ত দলিল লেখক ও দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া এবং উপজেলার জনসাধারণ জমি রেজিস্ট্রিতে দুর্নীতি দূর করতে  সিন্ডিকেট ঘোষিত কমিশন থেকে মুক্তির দাবি জানান।

সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাগজে ঘাটতি থাকা দলিল কত টাকা হলে রেজিস্ট্রি করবেন সাবরেজিস্ট্রার তা নির্ধারণ করেন পিয়ন মাহবুব কে। তাঁর বেঁধে দেওয়া টাকার পরিমাণ নড়চড় হলে জমি রেজিস্ট্রি করেন না সাবরেজিস্ট্রার সোহরাব । আর সেই ক্ষমতার দাপটে ঘুষের টাকা এদিক থেকে ওদিক করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন পিয়ন মাহবুব ।

এদিকে সমস্যার দলিলগুলো নিয়ে যদি কোনো দলিল লেখক সরাসরি সাবরেজিস্ট্রারের কাছে যান, তাহলে তিনি (সাবরেজিস্ট্রার) সোহরাব পরিষ্কার জানিয়ে দেন মাহবুবের  সঙ্গে কথা বলতে। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান মাহবুব । সাবরেজিস্ট্রারের পর অফিসের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মাহবুব ।

আলগী বাজার থেকে সেবা নিতে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সাবরেজিস্ট্রি অফিসের পিয়ন মাহবুব পিয়ন হলেও মূলত সাবরেজিস্ট্রারের ডান হাত। সাবরেজিস্ট্রার সরাসরি টাকা না নিলেও মাহবুবের মাধ্যমে প্রকাশ্যেই ঘুষের টাকা আদায় করছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রতি দলিলের চাহিদামতো টাকা না দিলে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তাঁর অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ।’

এদিকে নানান ফন্দি-ফিকিরে চলছে নরসিংদীর মনোহারদী সাব-রেজিস্ট্রার গোবিন্দ সাহার অফিস। ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না এ অফিসে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালবেষ্টিত অফিসটিতে প্রতিটি পর্যায়ে লাগে ঘুষ। অনৈতিক এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অফিসের প্রায় প্রত্যেকটা লোক। ফলে সেবা নিতে এসে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ আর হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

দলিল লিখক সমিতি সূত্রে জানা যায়, কোনো দলিল সৃজন করতে স্বাভাবিকভাবে দলিল মূল্যের ওপর শতকরা ১০-১২ টাকা হারে, ক্ষেত্র বিশেষে কম-বেশি অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ কোটি টাকা মূল্যের দলিলে আদায় করা হয় ১০-১২ লাখ টাকা। এ টাকার প্রায় অর্ধেক বিভিন্ন কর হিসাবে রাজস্ব খাতে যায়, বাকি টাকা দলিল লিখক, দলিল লিখক সমিতি, সাব-রেজিস্ট্রার এবং রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মরত সবাই ভাগবাটোয়ারা করে নেন।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপে রায়পুরা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ঘুষ গ্রহণের নানা রকমের ফন্দি-ফিকির ও হয়রানির চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদককে তারা জানান, অফিসটিতে দুপুর ২টার পর দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে চুক্তি করতে হয়। চুক্তির পরিমাণ কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা। এ চুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে বিলম্ব মাশুল। সেবা গ্রহণকারীর কাগজপত্রে ভুল থাকলে গুনতে হবে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া কোনো অজুহাত ছাড়াই অফিস সহকারীর টেবিলে দিতে হয় ২ হাজার টাকা। এমনকি টিপসই নেওয়ার সময়ও দিতে হয় টাকা। জানা যায়, বিরোধীয় ভূমি রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়ায় আছে ব্যতিক্রম সব ব্যাপার-স্যাপার। এ ধরনের ভূমি রেজিস্ট্রেশন হয় অজ্ঞাতসারে-গোপনে। অর্থাৎ বিরোধীয় এক পক্ষের অজান্তে অন্য পক্ষ সাব-রেজিস্ট্রার অফিসকে ম্যানেজ করে কোনো এক গোপন স্থানে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে। এ ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের চুক্তি করতে হয়। তবে এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন দালাল, দলিল লিখক ও অফিসে কর্মরত কোনো একজন কর্মচারী। এ প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয়েছে কমিশন।

আর এসবের সবকিছু নির্দিষ্ট কমিশনের নেওয়ার মাধ্যমে ব্যাকাপ দেন জেলা রেজিস্ট্রার আরিফুর রহমান   অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করার জন্য একাধিক বার সাব-রেজিস্ট্রার সোহরাব বা জেলা রেজিস্ট্রার আরিফুর রহমান কে   ফোন  দিলে কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

জনশ্রুতি আছে জুলাই আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য রমজান গভীর রাত পর্যন্ত কতিপয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডারদের সাথে শলাপরামর্শে লিপ্ত থাকতেন। এছাড়া ছাত্র জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করতে ওইসব ক্যাডারদের কোটি টাকা দেন |

 বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গণমাধ্যমে কোন সংবাদ প্রকাশিত হলে আমরা সেটা গুরুত্বের সাথে অনুসন্ধান করি।

বহু প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত  ৫ই আগষ্টের পর বৈষম্যেমুক্ত বাংলাদেশে ঘুষ ও দূর্নীতির বরপূত্র এই সমস্ত অফিসারদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত পূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে নরসিংদী জেলাবাসী।

You cannot copy content of this page