
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মানহীন বীজ সরবরাহ, বদলি বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ২৩ এপ্রিল জেলায় যোগদানের পর থেকেই তিনি পুরো বিভাগকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ২৩ এপ্রিল যশোরে যোগদানের পরপরই উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেনের নামে জেলার প্রতিটি সার ডিলারের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। ডিলারদের বাধ্য করে সংগৃহীত প্রায় ৩ লাখ টাকা তাকে ‘উপহার’ হিসেবে দিয়ে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে জেলায় তার প্রকাশ্য চাঁদাবাজির সূচনা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে ডিলারদের হয়রানি ও আর্থিক সুবিধা আদায়ের ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ বিতরণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ডিডি মোশাররফ হোসেন নিজেই নেপথ্যে থেকে ডিলারের ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি অত্যন্ত নিম্নমানের ও অংকুরোদগম ক্ষমতাশীল বীজ সরবরাহ করে প্রতিটি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে তা কিনতে বাধ্য করেন। কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এই মানহীন বীজ গছিয়ে দিয়ে তিনি প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রদর্শনীর জন্য সরকারিভাবে বীজ সরবরাহের নামেও লাখ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের দাবি, জেলার প্রতিটি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে ডিডি মোশাররফ হোসেন নির্দিষ্ট হারে মাসিক চাঁদা (মাসোহারা) আদায় করেন। কেউ এই অনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার অনুগত একটি ‘বিশেষ বাহিনী’ এবং নির্দিষ্ট কিছু নামধারী সংবাদকর্মীকে লেলিয়ে দিয়ে হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।
এমনকি অফিসের সাধারণ কর্মচারী বদলিতেও তিনি অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অতি সম্প্রতি ‘পলাশ’ নামের এক কর্মচারীর বদলির আদেশ কার্যকর করতে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সমস্ত তথ্য এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে কার্যালয়ের ক্যাশিয়ার তরিকুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে।
ডিডি মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েও কৃষি বিভাগে ও স্থানীয় মহলে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে। জানা গেছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভোল বদলে ডজনখানেক মন্ত্রী-এমপির ডিও লেটার (সুপারিশ) জমা দিয়ে ডিএস (ডেপুটি সেক্রেটারি) হওয়ার জোর তদবির চালান।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াতের সুপারিশে যশোরে ডিডি হিসেবে পদায়ন পেলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আবারও ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপি ঘরানার কর্মকর্তা হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। নিজের অনৈতিক সুবিধা টিকিয়ে রাখতে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ইফতার মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠানগুলোতেও সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়ে অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে কৃষি বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের আড়ালে ডিডি মোশাররফ হোসেন বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে জানা গেছে। চুয়াডাঙ্গায় তার একটি চারতলা আলিশান বাড়ি এবং বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে বৈধ আয়ের বাইরে কীভাবে তিনি এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেন, তা নিয়ে খোদ কৃষি বিভাগেই জোর গুঞ্জন চলছে।
যশোরের কৃষি খাতকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং এই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার লাগাম টানতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, সাধারণ সার ডিলার ও মাঠ পর্যায়ের ভুক্তভোগী কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোশাররফ হোসেনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে অভিযোগের বিবরণ উল্লেখ করে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা (টেক্সট মেসেজ) পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া (রেসপন্স) দেননি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :