এবার কোটি টাকা পকেটে ভরার অভিযোগ প্রকৌশলীকে পেটানো সেই ঠিকাদার লোকমানের বিরুদ্ধে, কাজ ছাড়াই তুলেছেন বিল
Rokonuz Zaman
প্রকাশের সময় : মে ৭, ২০২৬, ৯:০৯ অপরাহ্ন /
০
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:
একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে দেশব্যাপী আলোচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের প্রকৌশলীকে পেটানো ঠিকাদার লোকমান হোসেনের বিরুদ্ধে। এবার কাজ শেষ না করেই অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা বিল উত্তোলনের খবর ফাঁস হওয়ায় তোলপাড় চলছে। এমনকি ওয়ার্ক অর্ডার পাওয়ার একদিন পরই তুলে নেওয়া হয়েছে কোটি টাকার বিল। এদিকে প্রকৌশলীকে মারধরের পর থেকে পলাতক রয়েছেন সেই ঠিকাদার।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, জেলার নবীনগর উপজেলায় একাধিক সড়ক নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স লোকমান এন্টার প্রাইজের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ অসমাপ্ত রেখে সরকারের বরাদ্দ করা অধিকাংশ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
উপজেলার আলীয়াবাদ থেকে গোপালপুর পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সড়ক নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর, যা শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর। তবে ৫ কিলোমিটারের মধ্যে তিন কিলোমিটার কাজ করেই ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা উত্তোলন করে ফেলেছেন ঠিকাদার লোকমান।
এ ছাড়া নবীনগরের জীবনগঞ্জ বাজার থেকে শাহপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ কোটি ৩৪ লাখ টাকার একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পান ঠিকাদার লোকমান হোসেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এলজিইডি গত ২ মার্চ এক চিঠিতে কার্যাদেশ প্রদান করে। এর একদিন পরই, ৪ মার্চ নবীনগর উপজেলা প্রকৌশলী আরেক চিঠিতে কাজ চলতি দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৪৩৯ টাকা বিল পরিশোধের সুপারিশ করেন। এরই আলোকে ইতোমধ্যে ওই টাকা কাজের বিপরীতে তুলে নেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদার যতটুকু কাজ করবেন, ততটুকু কাজের টাকাই উত্তোলন করতে পারবেন। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে এক কোটি টাকার কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হলে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। এরই প্রেক্ষিতে সেই প্রকল্পে তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে সড়কের পাশে পুকুরের পাড়ে রিটার্নিং ওয়াল ছাড়া মাটি ফেলায় স্থানীয় পথচারীরা পড়েছেন বিপাকে।
স্থানীয় আবুল কাসেম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আগেই ভালো ছিল। এখন চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঠিকাদার যদি কাজ না করে, তাহলে যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়- সেই দাবি জানাচ্ছি।’
এই সড়কের নিয়মিত রিকশাচালক আরিফ মিয়া বলেন, ‘দেখেন রাস্তাটা কেমনে রেখে গেছে! এখন রিকশা যাইতে-আইতে কষ্ট হয়।’
রতনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ঠিকাদার বলার পর একটি পুকুর দ্রুত শুকানো হয়। কিন্তু কোনো ধরনের রিটার্নিং ওয়াল না দিয়েই পুকুরের পাশে তড়িঘড়ি করে মাটি ফেলা হয়েছে। রোজার পর থেকে কাজও বন্ধ রয়েছে।’
এদিকে নবীনগরের মেরকুটা বাজার থেকে শিবপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কাজেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রায় ১৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার এই প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে ঢাকা থেকে এলজিইডির একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসে। পরিদর্শনকালে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে স্থানীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার লোকমান হোসেন ও তার সহযোগীরা প্রকৌশলী তরিকুল ইসলামের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে প্রতিনিধিদলের সামনেই প্রকৌশলীকে মারধর করা হয় এবং তাকে তাড়া করা হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পলাতক রয়েছেন ঠিকাদার লোকমান হোসেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদার লোকমান হোসেনের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার বড় ভাই মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এটাতে সমস্যা কোথায়? হয়ত কার্যাদেশের চিঠি দিতে দেরি করেছে। যে কারণে চিঠি পাওয়ার আগে কাজ শুরু করে ফেলা হয়। তবে বিষয়টি সম্পর্কে আরও জেনে বিস্তারিত বলা যাবে।’
নবীনগর উপজেলা প্রকৌশলী ফেরদৌস আলম বলেন, ‘আমি যোগদান করেছি বেশি দিন হয়নি। যোগদানের পরই বিষয়গুলো নজরে এসেছে। একদিনের ব্যবধানে কীভাবে এক কোটি টাকার কাজ করে ফেললো, তা বুঝে আসছে না। এ ঘটনায় উপসহকারী প্রকৌশলীকে শোকজ করা হয়েছে। এ ছাড়া আলীয়াবাদ সড়কটি নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সড়কটি নবনির্বাচিত এমপির বাড়ির পাশে হওয়ায় সেখানে সামান্য কাজ করা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :