
বিশেষ প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের বালুচরা এলাকায় অবস্থিত বিআরটিএ কার্যালয়টি যেন এখন দুর্নীতির এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। আর এই দুর্গের অলিখিত ‘সুলতান’ হলেন জেলা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহ। অভিযোগ উঠেছে, পলাতক সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ‘আস্থাভাজন’ হওয়ার সুবাদেই সলিম উল্যাহ চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তে গড়ে তুলেছেন এক বিশাল লুটপাটের রাজত্ব। সরকার পরিবর্তন হলেও রহস্যজনকভাবে এখনও বহাল তবিয়তে নিজের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এই ক্ষমতাধর কর্মকর্তা।
ওবায়দুল কাদেরের ‘খাস লোক’ হিসেবে দাপট:
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, সলিম উল্যাহ কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তাই নন, বরং তিনি ছিলেন ওবায়দুল কাদেরের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ছায়াসঙ্গী। কাদেরের দাপট দেখিয়ে গত দেড় দশকে বিআরটিএ-তে তিনি নিজের সমান্তরাল প্রশাসন চালিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে স্বৈরাচারী সরকারের রাঘববোয়ালরা আত্মগোপনে বা শ্রীঘরে, সেখানে কাদেরের এই ‘ক্যাশিয়ার’ সলিম উল্যাহ এখনও কীভাবে একই পদে থেকে তার দুর্নীতির চাকা সচল রেখেছেন?
শত কোটির সম্পদ ও বিলাসবহুল প্রাসাদ:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিআরটিএ-তে ওবায়দুল কাদেরের আর্শীবাদ কাজে লাগিয়ে সলিম উল্যাহ গত কয়েক বছরে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকা লালখান বাজারে তার রয়েছে দুটি নজরকাড়া বিলাসবহুল ভবন। এছাড়া স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। বিভিন্ন ব্যাংকে তার স্ত্রীর নামে কয়েক কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্যও দুদকের নাগালে এসেছে।
ঘুষের ‘ওপেন’ রেট চার্ট:
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, সলিম উল্যাহর এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি সাধারণ গ্রাহকরা। ঘুষের টাকা ছাড়া এখানে কোনো ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যায় না। সিন্ডিকেটের নির্ধারিত ঘুষের তালিকাটি হলো:
রুট পারমিট: নতুন বাসের জন্য ১০ হাজার এবং নবায়নে ৪ হাজার টাকা।
মালিকানা পরিবর্তন: প্রতি গাড়িতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
ফিটনেস: গাড়ির ধরন অনুযায়ী ১৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা।
ড্রাইভিং লাইসেন্স: নতুন লাইসেন্সের জন্য ৫ হাজার টাকার ‘অঘোষিত চুক্তি’ বাধ্যতামূলক। টাকা না দিলে শতভাগ নির্ভুলভাবে পরীক্ষা দিলেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাকে ‘ফেল’ করিয়ে দেওয়া হয়।
এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কাদেরের লোক হওয়ায় সলিম উল্যাহর কথার ওপর কথা বলার সাহস কারো ছিল না। তিনি এখনও সেই আগের মতোই দাপট দেখাচ্ছেন।”
দুদকের অভিযান ও পলাতক সলিম উল্যাহ:
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। দুদকের চট্টগ্রাম-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জানিয়েছেন, “সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহর বিরুদ্ধে ওবায়দুল কাদেরের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে অভিযোগ ওঠার পর এবং দুদকের গোয়েন্দা নজরদারির খবর পেয়েই সলিম উল্যাহ কৌশলে অফিস থেকে সরে পড়েছেন এবং তার মুঠোফোনটি বন্ধ রেখেছেন।
জনগণের দাবি:
চট্টগ্রামের সচেতন মহলের দাবি, ওবায়দুল কাদেরের মতো স্বৈরাচারী নেতার বিশ্বস্ত এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। তার অবৈধভাবে অর্জিত শত শত কোটি টাকা এবং লালখান বাজারের রাজপ্রাসাদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার দাবি এখন সর্বস্তরের মানুষের।
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :