ভোগান্তির অপর নাম ‘ডিলারশীপ’; প্রতারণার জালে চুয়াডাঙ্গার নতুন উদ্যোক্তারা


আশিকুল হক (শিপুল), স্টাফ রিপোর্টারঃ প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৬, ২০২৫, ১০:৫৮ অপরাহ্ন /
ভোগান্তির অপর নাম ‘ডিলারশীপ’; প্রতারণার জালে চুয়াডাঙ্গার নতুন উদ্যোক্তারা

বাংলাদেশের পণ্যবাজারে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন স্থানীয় ডিলাররা। নিজের অর্থ, সুনাম ও ঝুঁকি নিয়ে বাজারে নিত্যপণ্য সরবরাহ করেন তাঁরা। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-চক্রটিকেই টার্গেট করে একদল অসাধু কোম্পানি গড়ে তুলেছে সুপরিকল্পিত প্রতারণার নেটওয়ার্ক।

শত শত ব্যবসায়ীর অভিযোগ—ডিলার নিয়োগের নামে শুরু হয় প্রলোভনের খেলা, শুরুতে সর্বনিম্ন বিনিয়োগের কন্ডিশন দিয়ে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নিয়ে সময় সাপেক্ষে ডিলারদেরকে স্থানীয় পর্যায়ে মাল পৌছে দেয় এই সব কোম্পানি। এমনকি এই সব পন্যের গুনগত মান সাম্পল প্রোডাক্ট থেকেও যথেষ্ট নিম্নমানের আর ড্যামেজ ও সল্পমেয়াদী পন্যতো সাথে থাকেই। এগ্রিমেন্টে নানাবিধ শর্ত থাকলেও এক পর্যায়ে মাসের পর মাস অপেক্ষার পরেও ডিলার পয়েন্টে দেখা মেলে না কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির এমনকি কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দের সাথেও যোগাযোগ মেলে না মুঠোফোনে। সময়ান্তে বন্ধ হয়ে যায় কোম্পানি আর ধরে পাওয়া যাইনা কাওকেই। ফলশ্রুতিতে ছোট দোকানে পন্য পৌছাতে না পেরে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ও পুজি হারাচ্ছেন স্থানীয় পর্যায়ের ডিলার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

অনুসন্ধানে উঠে এলো চক্রের কৌশল

মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে—

  • বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানির নাম ব্যবহার,

  • বাজারে নতুন পণ্যের “কৃত্রিম চাহিদা” তৈরি,

  • সর্বনিম্ন বিনিয়োগের শর্তে ডিলারশিপের প্রলোভন,

  • অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর পণ্য সরবরাহে সময়ক্ষেপণ,

  • স্যাম্পল থেকে নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য পাঠানো,

  • বিক্রয় প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা—

  • প্রথম অর্ডারে পন্য ক্রয়ের ও বিনিয়গের বাধ্যতামূলক শর্ত
    অগ্রিম টাকা গ্রহনের পর পন্য পাঠানোয় সময়ক্ষেপণ

সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে প্রতারক কোম্পানিগুলো।

অভিযোগ রয়েছে, উদ্দেশ্য একটাই—যত দ্রুত সম্ভব অগ্রিম টাকা সংগ্রহ করা। এরপর  সাপোর্ট, যোগাযোগ—কিছুই আর পাওয়া যায় না।

চুয়াডাঙ্গার নতুন উদ্যোক্তার আর্তনাদ: ‘পুঁজির চেয়েও বড় ক্ষতি—সুনাম’

চুয়াডাঙ্গার কেদারগঞ্জ পাড়ার এক তরুণ উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে চক্রের আরও চিত্র পাওয়া যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি জানান—

পন্য ঘরে পৌছে দেওয়ার পর কোম্পানি বিক্রয় প্রতিনিধি দেইনি। উপরন্তু আমার নিজস্ব নেটওয়ার্ক এ পরিচিত দোকানদার, সুপারসপ গুলোতে পন্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও দিতে পারছি না কোম্পানির জনবল ও সদিচ্ছার অভাবে। এখন সমাধান দেওয়া তো দুরের বিষয়, কর্মকর্তারা ইমেইল, কল কোন কিছুরি রেসপন্স করেনা। তাছারা গুদাম ঘর, ডেলিভারি ম্যানের বেতন অন্যান্য খরচ তো সাথে আছেই।

তার দাবি, নতুন ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে এসব প্রতারণা বাড়ছে। কিন্তু নজরদারি নেই, অভিযোগ করেও সমাধান মেলে না।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: নিয়ন্ত্রণ না হলে বাজারে বাড়বে অস্থিরতা

বাজার বিশ্লেষকদের মতে—ডিলারশিপ প্রতারণা এখন নতুন ব্যবসায়িক অপরাধের রূপ নিয়েছে।
তাদের ভাষায়—

  • “ডিলারদের অর্থ নয়, পুরো বাজারব্যবস্থাই ঝুঁকিতে।”

  • “অসাধু কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।”

সরকারি নজরদারি জোরদারের দাবি

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরকারি রেজিস্ট্রেশন যাচাই, কমপ্লায়েন্স চেক, ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্স ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি, প্রতারণা প্রতিরোধে

  • দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল,

  • ভোক্তা অধিকার–সদৃশ ডিলার অধিকার আইন,

  • এবং জেলা পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ইউনিট গঠন প্রয়োজন।

নইলে এই চক্র আরও শক্তিশালী হবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সবচেয়ে বড় বাজারশক্তি—স্থানীয় ডিলাররা।

You cannot copy content of this page