
দুর্নীতি, অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার আখড়ায় পরিণত হয়েছে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর । এই দপ্তরের অন্যতম আলোচিত চরিত্র পরিবার পরিকল্পনা সহকারী মোঃ প্রিন্স সোহেল ওরফে প্রিন্স।
চেহারা-সুরতে সুদর্শন, কথাবার্তায় তুখোড় তাকে দেখলে অনেকে প্রথমে রাজনৈতিক কর্মী মনে করেন। গত ১৭ বছর তিনি ছিলেন ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে নিজেকে বিএনপির একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা পোস্ট দিয়ে জাহির করেন বিত্তবৈভব আর প্রাচুর্যে ভরা জীবন।
প্রিন্সের মা বাবুগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর একজন কল্যাণ সহকারী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, মায়ের কোটা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে তিনি এই চাকরি পেয়েছেন। রাজনৈতিক অবস্থান বদলালেও তার প্রভাব-প্রতিপত্তি আর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বরং বেড়েছে বহুগুণে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বানারীপাড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের কর্মচারীদেরও তিনি প্রভাবিত করেন এবং কাউনিয়া এলাকার সন্ত্রাসীদের দিয়ে দমন করার হুমকি দেন নিয়মিত।
জনশ্রুতি আছে, প্রিন্স সোহেল নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। স্ত্রী অসুস্থ বলে তিনি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থেকেও উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আফসানা আরেফিনের সহযোগিতায় সরকারি কোষাগার থেকে মাসে মাসে বেতন তুলে নিচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু তাই নয়—মাঠকর্মীদের কাছ থেকেও তিনি নানা অজুহাতে অর্থ উত্তোলন করেন।
প্রিন্স সোহেলের প্রভাব বিস্তারের পেছনে রয়েছে চাখার ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক কাজী আতিকুর রহমান অপু। পুরোনো দিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি পুরো বানারীপাড়া এলাকায় প্রভাব খাটাচ্ছেন। সরকারি কাজে অবহেলা, দায়িত্ব ফাঁকি দেওয়া আর অনিয়ম আড়াল করতে এই সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কর্মস্থলে দায়িত্ব না পালনের পাশাপাশি প্রিন্স সোহেল ও তার সহযোগীরা চালাচ্ছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বরিশালের তালতলী এলাকায় তিনি ‘মাটির সাজ রেস্তোরাঁ’ নামে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন। এছাড়া, কয়েকটি প্রাইভেট ক্লিনিকের সঙ্গে রোগী রেফার করার কমিশন বাণিজ্যে যুক্ত আছেন।
অভিযোগ আছে, সিজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে তিনি কমিশনভিত্তিক দালালি করেন। এখানেই শেষ নয়, তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।
প্রিন্স সোহেলের রাজনৈতিক অবস্থানও এলাকাবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই সময় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নানা সুবিধা ভোগ করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে বিএনপির নিবেদিত কর্মী হিসেবে জাহির করতে শুরু করেছেন। ফলে তাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনা তুঙ্গে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবার পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবাখাতে এ ধরনের অনিয়ম আর দায়িত্বহীনতা মেনে নেওয়া যায় না। প্রিন্স সোহেলের মতো একজন সহকারীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে সেবাপ্রত্যাশীরা প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
বানারীপাড়ার এক প্রবীণ শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
“জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা যাদের, তারা আজ সাধারণ মানুষের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তদন্ত চাই, শাস্তি চাই।”
এইসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বানারীপাড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা সহকারী প্রিন্স হোসেনের মোবাইলে একাধিক বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এমনকি বানারীপাড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আফসানা আরেফিনের সরকারি মোবাইলে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।
বানারীপাড়ার সাধারণ মানুষ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—প্রিন্স সোহেলসহ পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :