এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি গঙ্গাচড়া উপজেলায় ঝড়ে বিধ্বস্ত পরিবারগুলোর


মোঃ শফিকুজ্জামান সোহেল, রংপুর প্রতিনিধি : প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১১, ২০২৫, ৩:৫৭ অপরাহ্ন /
এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি গঙ্গাচড়া উপজেলায় ঝড়ে বিধ্বস্ত পরিবারগুলোর

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় আলমবিদিতর ও নোহালী ইউনিয়নে সাত শতাধিক ঘরবাড়ি ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আলমবিদিতরের খামার মোহনা, কুতুব ও কিশামত গণেশ এলাকায় ৪০০ ঘরবাড়ি ও নোহালী ইউনিয়নের সরদারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ৩০০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ঝড়ের তাণ্ডবে টিনশেড ও আধা-পাকা ঘরবাড়ি, গাছপালা ভেঙে পড়ে। এতে পাঁচজন আহত হয়েছেন।

‎ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ছয় দিন ধরে খোলা জায়গায় অবস্থান করলেও মেলেনি তেমন কোন সরকারি-বেসরকারি সাহায্য। নেই খাবার, সেই সঙ্গে মাথা গোঁজার ঠাঁইও।

‎৬ দিন দিন কেটে গেলেও অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হয়নি মাথা গোঁজার ঠাঁই। কেউ পলিথিনে তাবু টাঙিয়ে আছেন, কেউবা অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।

‎নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী আদর্শপাড়ায় ৫৫ বছর বয়সী তহমিনা বেগম বলেন, স্বামী নাই আট বছর হইল, মেয়েগুলারে বিয়া দিছি। এখন এক ছেলে আর আমি, নিজের জমিও নাই। মাইনষের জমিত থাকি। ছওয়াটা মাইনষের জমিত কাজ করে কোনো রকমে দিন চালাই। নতুন ঘর কেমনে তুলমো, সেই চিন্তাতেই এলা দিন কাটে। দুইটা ঘর দুইটাই ঘূর্ণিঝড় খাইল।’

‎ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটায় মুহূর্তেই উড়ে গেছে তহমিনা বেগমের দুইটা ঘর। এখন তিনি আছেন টাঙানো পলিথিনের নিচে।

‎সরজমিনে গিয়ে খামার মোহনা এলাকায় দেখা যায়, ঝড়ে বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে গ্রামটি। বাড়িঘর ও গাছপালা মিশে গেছে মাটিতে। আধাপাকা বাড়ির টিনের চালও উড়িয়ে নিয়ে গেছে এক কিলোমিটার দূরে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঘর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। খোলা জায়গায় রান্নার প্রস্তুতি চলছিল বেশ কয়েকটি পরিবারের। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতরে খুঁজছিল বই-খাতা, ব্যাগসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ। ধ্বংসপ্রায় বাড়িতে রান্নার পরিবেশ না থাকায় না খেয়ে আছেন অনেকেই।

‎নজরুল ইসলামের ঘরের সামনে গেলে দেখা যায়, তিনি নাতি তামিমের ভিজে যাওয়া বই-খাতা শুকাচ্ছিলেন। তিনি জানান নাতিকে তার নানা তহুবর রহমান এসে নিয়ে গেছেন। প্রতিবেদককে আক্ষেপ করে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নাতিটাক নিয়েই এই ঘরটাতে থাকোং। সেই ঘরোতও আর থাকা যায় না। আইজ না হউক, কাইল ঘর ভালো হইবে। তয় নাতিটার বইগুলা নষ্ট হইলে কোনটে পাইম!’

‎আরেক ক্ষতিগ্রস্ত রফিকুল ইসলাম বলেন, দুই মিনিটের ঝড় সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে। ঘরের টিন উড়িয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূরে। কিছু অবশিষ্ট নেই। পরিবার নিয়ে উপোস করছি।

‎আমিনুর রহমান বলেন, এখনও সরকারি কোনো সাহায্য পাইনি। দূর গ্রাম থেকে খালা ভাত নিয়ে এসেছিলেন। তাই খেয়ে দিন কাটছে। বেশির ভাগ পরিবারে তাদের আত্মীয়স্বজন খাবার নিয়ে এসে খাওয়াচ্ছেন।

‎খামারে ৮০০ মুরগি ছিল আইনুর রহমানের। ঝড়ে বাড়ির সবকটি ঘরের সঙ্গে খামারও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মুরগিগুলো মারা গেছে। খালি ভিটায় বসে বিলাপ করছিলেন তিনি। মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া ঘরের ভেতর বই-খাতা খুঁজছিলেন তাঁর কলেজপড়ুয়া ছেলে লিটন মিয়া।

‎আনোয়ারমারী ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী লিটন বলেন, সব বই ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এই ক্ষতি পূরণ হবে না। পাশেই বসে কাঁদছিল আশরাফুল আলমের মেয়ে কচুয়া আহমদিয়া মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়শা খাতুন। সে বলে, ‘অভাবের সংসারে কষ্ট করে পড়াশোনা করি। ঝড়ে ঘর পড়ে যাওয়ায় সব বই-খাতা ভিজে গেছে। এসব আর কে কিনে দেবে!’

‎আলমবিদিতর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আফতাবুজ্জামান চয়ন বলেন, আকস্মিক ঝড়ে দুই ইউনিয়নের সাত শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আট টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

‎উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ১০ কেজি চাল, নগদ অর্থ ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। টিন ও আর্থিক বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। আমরা আশা করছি, সেটা পেলে তাদের পুনর্বাসনের জন্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারব।’

You cannot copy content of this page