

“ঝিনাইদহের সিও এনজিও: ভুয়া কাগজ, ঘুষ ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দাঁড়ানো দুর্নীতির দুর্গ”
“অডিট রিপোর্টে মিথ্যা, মাঠপর্যায়ে লুটপাট—মাইক্রোক্রেডিটের নামে শতকোটি টাকা উধাও”
“পরিবারের নামে কোটি কোটি টাকা, কর্মকর্তাদের নামে মামলা—সিও’র গোপন খেলা”
“শিক্ষিত যুবকদের চাকরির নামে প্রতারণা, শ্রম আইন ভঙ্গের দায়ে ঘনঘন মামলা”
ঝিনাইদহের সিও এনজিরনির্বাহী শামসুল আলমের জালিয়াতি দুর্নীতি অনিয়মের শেষ কোথায়?
ঝিনাইদহ সদর শহরের সার্কিট হাউজ রোডের চাকলাপাড়ায় অবস্থিত “সোসিও ইকোনোমিক হেলথ এডুকেশন অর্গানাইজেশন (সিও)”— স্থানীয়ভাবে পরিচিত “সিও টাওয়ার”—কে কেন্দ্র করে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এনজিওটির বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শামসুল আলমের জীবন কাহিনি যেন দুর্নীতি ও জালিয়াতির এক “সাফল্যের” গল্প।
সিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক শামসুল আলম একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান তিনি শুরুর দিকে কলার ব্যবসা ও মুদি দোকানদারী করতেন। তার মুদি দোকানের নাম ছিল ভাই ভাই স্টোর। 

সিও’র যাত্রা শুরু হয় ‘প্রগতি সংঘ ক্লাব’ নামে রাজাপুর, পো: বানিয়াকন্দর, ঝিনাইদহ সদর, ঝিনাইদহ ঠিকানার এক ক্ষুদ্র সংগঠন দিয়ে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে নেওয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর পরে ভুয়া কাগজপত্র আর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বদলে ফেলা হয় ‘সিও’ নামে। নাম বদলের এই কৌশলই ভবিষ্যতে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের পথ খুলে দেয়।

শামসুল আলম দরিদ্র পরিবারের সন্তান, যিনি শুরুতে কলার ব্যবসা ও মুদি দোকান চালাতেন। শিক্ষাগত যোগ্যতায় এসএসসি-ও পাশ করতে না পারলেও বয়স্ক শিক্ষার প্রকল্পে ভূয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে ভাগ্য বদলাতে শুরু করেন। ২০০৩-০৪ সালে বিশেষ তদবীর ও ঘুষের বিনিময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহায়ন তহবিল থেকে প্রথমে ১০ লাখ এবং পরে ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ পান। এরপর ঘুষ দিয়ে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি (MRA) থেকে সনদ সংগ্রহ করেন।

বর্তমানে এনজিওটির নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ কর্মসূচি পরিচালনার কথা বলা হলেও এর বড় অংশই আত্মসাত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, এই ঋনের টাকা থেকে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে শামসুল আলম নিজের নামে, বউয়ের নামে, ছেলের নামে জমি বাড়ি ও ঢাকায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ২টি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছে।
এই টাকা নিজে আত্মসাত করার জন্য সিও তে কর্মরত প্রায় ৫০০ জন কর্মকর্তা কর্মচারীর নামে ঝিনাইদহ আদালত সহ সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে চলমান রয়েছে।

ঋন গ্রহন ও বিতরনের তথ্য সরকার প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে যদি সঠিক ভাবে যাচাই করে তাহলেই সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে যে, আত্মসাত করা টাকা আড়াল করার জন্য অবৈধভাবে কর্মকর্তা কর্মচারীদের নামে মামলা করা হয়েছে।
নিয়মনীতি ভেঙে শামসুল আলম নিজের ছোট ভাইকে, যিনি পড়াশোনা জানেন না, সংস্থার “ঋণ কার্যক্রম পরিচালক” বানিয়ে লক্ষাধিক টাকার বেতন দেন। তার ছেলে-মেয়েসহ আত্মীয়স্বজনদের নামেও বেতন ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা ভাগ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিও প্রায়ই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও চাকরির নামে টাকা আদায়, ট্রেনিং ফি ও জামানত নেওয়ার অভিযোগ আছে। যোগ্য প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা, আবার যাদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের শ্রম আইন না মেনে মানসিক নির্যাতন করা হয়। নিয়ম না মানায় প্রায়ই কর্মীরা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন, কারও নামে মামলা পর্যন্ত করা হয়।
প্রতিবছর সিও’র অডিট রিপোর্ট ও মাসিক রিপোর্টে ঘাটতি নেই দেখানো হয়। ব্যাংক থেকে পাওয়া মাইক্রোক্রেডিট ঋণের টাকা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হচ্ছে, অথচ কাগজে কলমে দেখানো হয় প্রোগ্রাম চলমান। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান MRA-কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামসুল আলম রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় প্রশাসনিক বা আইনগত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে এমআরএ-এর এক পরিচালককেও মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এমনকি সাবেক সরকারের শিল্প-বাণিজ্য উপদেষ্টা দরবেশ বাবার সাথেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ছবি রয়েছে,

যা শামসুল আলমকে আরও শক্তিশালী করেছে।

৫ই আগষ্ট পট পরিবর্তনের পর ভোল পাল্টিয়ে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার আস্থাভাজন হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এভাবে যদি অনিয়ম চলতে থাকে, সিও অচিরেই দেউলিয়া হয়ে পড়বে। অথচ দেশের শীর্ষস্থানীয় মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান—ব্র্যাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, সাজেদা ফাউন্ডেশনসহ—অনিয়ম ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে চলছে। প্রশ্ন উঠছে: কেন সিও-তে এত দুর্নীতি চলছেই?
অতএব, সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমআরএ যদি সত্যিকার অর্থে সঠিক তদন্ত ও তদারকি না করে, তবে সিও কেবল আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রতীকই নয়, বরং কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণার এক “দৃষ্টান্ত” হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিওর নির্বাহী পরিচালক শামসুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :