*অনুমোদনহীন রেস্টুরেন্ট, বার, সিসা লাউঞ্জ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়।
*‘স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটি’ ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়।
*অভিযানের ভয় দেখিয়ে চাঁদা না দিলে মানববন্ধন ও পরবর্তীতে অভিযান।
*পূর্বাচলে একাধিক প্লট, পৈতৃক এলাকায় জমিজমা ও সম্পদের পাহাড়।
*বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার তথ্য
*উপ-পরিদর্শক নাজমুল নামে এক কর্মকর্তাকে চাঁদা আদায়ের কাজে ব্যবহার
*ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল।
চলমান রাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলোর অন্যতম মাদক। ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি মাদক নেশা। সর্বনাশা মাদক বাঁধাগ্রস্ত করেছে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন। থামিয়ে দিয়েছে দেশের অগ্রগতি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাজ হলো দেশকে মাদকমুক্ত করা। তবে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সীমাহীন অনিয়ম দুর্নীতি কারণে মাদকের বানে ভাসছে দেশ।
নেশার ফ্যাশানে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে কিশোর কিশোরীরা। ধ্বংস হচ্ছে আমাদের যুব সমাজ। দেশের সীমাহীন মাদক বিস্তারের সাথে সাথে বাড়ছে অপরাধ, নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠেছে জনজীবন। নিয়ন্ত্রণে হিমসীম খাচ্ছে সরকার। অপরাধ ও মাদক বিস্তারের নেপথ্যে অভিযোগের তীর মাদক অধিদপ্তরের দিকে। জনগণের কাছে হাস্যকর গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে সরকারের এই সেক্টর। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অধিদপ্তরে গড়ে উঠেছে বিশেষ বলয়। তাদের কথা মতোই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রাইজ পোস্টিং, বদলি, নিয়োগ, অবৈধ সুবিধা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আটকে রাখা, রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন না দেওয়া, অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট প্রতিবেদন দেওয়া, খেয়াল-খুশি মতো বার বার লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন করাসহ সব রকম অনিয়ম অনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রীত হয়ে আসছে। বিগত সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু পরিষদের শাখা খুলে দীর্ঘদিন ধরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে রাজত্ব করেছে অসাধু এসব কর্মকর্তা। নিজেদের মতো করে প্রকাশ্যে গড়ে তুলেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে এই সিন্ডিকেটই সর্বোচ্চ শক্তিশালী, ক্ষমতাধর। মাদক ব্যবসায়ীদের টাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রায় মজমা হতো অভিজাত পাড়ার হোটেল রেস্তোরায়। আওয়ামী শাসনকালে অলৈকিক শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতারা কাউকে তোয়াক্কা করতো না। এদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই তাকে জামায়াত-শিবিরের ট্যাগ লাগিয়ে বদলি ও বিভিন্ন ভাবে হয়রানী করা হতো। আবার সখ্যতায় মিলতো প্রাইস পোস্টিং। পোস্টিংয়ে নেওয়া হতো এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা। সেসময়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা হতে পিওন দারোয়ানরা অবৈধভাবে দু’হাত ভরে কামিয়েছে কোটি কোটি টাকা। নামে বেনামে হয়েছে অঢেল সহায় সম্পদের মালিক। অধিদপ্তরের একটি সূত্র যবাকে জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় মাদক, মাদকসেবী ও মাদক কারবারী, মদের বার বেশি সেসব এলাকায় মাদকের কর্মকর্তাদের অবৈধ আয় বেশি হয়। তাই ওই এলাকায় পদায়ন হওয়াকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ ভাষায় ‘প্রাইস পোস্টিং’ বলা হয়। দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণে কালক্রমে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয় মূলত এদের অনৈতিকতার কারণেই দেশের সীমাহীন ক্ষতি হয়েছে। দেশে ক্ষমতার পালা বদল হলেও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চলছে আগের নিয়মেই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, চাঁদাবাজি এবং কথিত ‘স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটি’র মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টির অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিতে খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যেন অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। আর এই নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরের ‘অনিয়ন্ত্রিত রাজা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন শামীম আহমেদ, যিনি বর্তমানে উপ-পরিচালক (উত্তর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গুলশান-বনানী এলাকার বিভিন্ন স্পট ও গোপন সূত্রে উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদ পুষ্ট হয়ে শামীম আহমেদ ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। সে সময় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে ওঠা অনুমোদনহীন রেস্টুরেন্ট, বার, সিসা লাউঞ্জসহ বিভিন্ন স্পট থেকে তিনি কোটি কোটি টাকা আয় বহির্ভূত অর্থ উপার্জন করেছেন। রাজধানীর ধনীদের কাছে বিলাসী আবাসন হিসেবে খ্যাত পূর্বাচলে তার একাধিক প্লট এবং পৈতৃক এলাকায় প্লট, ধানিজমি সহ অসংখ্য সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলেও জানা গেছে।
বেপরোয়া শামীম ও ‘স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটি’
সূত্র জানায়, বর্তমানে শামীম আহমেদ রাজধানীর উত্তরের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আগের থেকেও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গুলশান-বনানী এলাকার অভিজাত হোটেল, সিসা লাউঞ্জ ও বার থেকে অভিযানের ভয় দেখিয়ে তার নিয়ন্ত্রিত ‘স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটি’ নামক একটি কথিত ‘কমিটি সিন্ডিকেট’ মোটা অংকের অর্থ আদায়ের মিশনে নেমেছে। কথিত ওই কমিটির সদস্যরা শামীম আহমেদের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেন। এসব ভয়-ভীতির পরে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না মিললে কখনও কখনও উক্ত প্রতিষ্ঠানের সামনে কথিত কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। কথিত রয়েছে, উক্ত স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন শামীম আহমেদ। এমন মানববন্ধনের পর উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ অভিযান পরিচালনা করে কাঙ্ক্ষিত অর্থ হাতিয়ে নেন।
সম্প্রতি বনানীর ১১ নম্বর রোডে ‘হেইজ সিসা লাউঞ্জে’ এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সামনে মানববন্ধন করেছিল স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটি। সেই মানববন্ধনের কয়েকদিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান পরিচালনা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
মাদকের ভয়াল থাবা রোধে কাজ করা আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্নীতিবাজ, অর্থলোভী, চাঁদাবাজ ও ধান্দাবাজদের দৌরাত্ম্যের কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনেক সফলতা থাকলেও তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গুলশানের একটি অভিজাত এলাকার হোটেল কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমকে জানায়, শামীম আহমেদ বর্তমান পদে দায়িত্বে বসার পর থেকে এলাকার সকল ব্যবসায়ী আতঙ্কে রয়েছেন। কথিত স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটির ব্যানারে গুলশান-বনানী জুড়ে চলছে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও ফিটিং বাণিজ্য, যা সকলের কাছে ‘ওপেন সিক্রেট’।
টাকার নেশায় বুদ কর্মকর্তা!
সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই মনে করেন, মাদকের ছোবল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা নিজেই টাকার নেশায় বুদ হয়ে থাকলে ‘অভিযান নামক নাটক’ মঞ্চস্থ করে সমাজের ও রাষ্ট্রের মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
সূত্র আরও জানায়, বিগত সরকারের আমলে শামীম আহমেদ আওয়ামী লীগের নামধারী বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদকসহ এমন সময়ে তার সবগুলো বদলিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক। স্বাধীন বাংলা মাদকবিরোধী কমিটির উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি ওই সংগঠনের অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এছাড়াও শামীমের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত উপ-পরিদর্শক নাজমুলের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায় শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মাদকাসক্ত ছেলে শাফি মোদাছ্ছের খানের প্রিয়জন পরিচয় দিয়ে কর্মস্থলে স্ব ক্ষমতার বলয়ে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালি সিন্ডিকেট।
জনশ্রুতি আছে জুলাই আগস্ট ২০২৪ এর ছাত্র আন্দোলন দমন করতে উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ প্রতিরাতে ঢাকা মহানগর যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে করতেন গভীর শলাপরামর্শ। আর ছাত্র আন্দোলন দমাতে লক্ষ লক্ষ টাকা ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডারদের মাঝে বিতরণ করেন।
তবে ৫ই আগষ্ট পট পরিবর্তনে শেখ হাসিনা দিল্লি পালিয়ে গেলে শামীম আহমেদ টানা প্রায় ৩ সপ্তা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।
তবে কিছুদিন পর সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকলে আস্তে আস্তে মাটি ফুঁড়ে বের হতে থাকে। এরপর সপ্তাহ দুই ফেরেস্তা সেজে থাকলেও এখন আবারো শেখ হাসিনার দোসর এই চক্র পূর্বের ন্যায় স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে শামীম আহমেদের সাথে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি।
দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বিভাগীয় শাস্তি দাবি করেছে ভুক্তভোগী জনতা |
আপনার মতামত লিখুন :