
*সবজি বীজ বিতরণে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ
*পেঁয়াজ ও অড়হর বীজ বিতরণেও নয়ছয়
*৩ দিনের ট্যুর ১ দিনে শেষ করে অর্থ আত্মসাৎ
*৪০ লাখ টাকার কৃষিযন্ত্র গায়েব
*ঢাকায় জমি, বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পেতাত্মারা এখনও লোভনীয় পদে অধিষ্ঠিত, পাচ্ছেন পদন্নোতি । বড় বড় প্রকল্প এখন এসব পেতাত্মাদের দখলে। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে বড় বড় প্রকল্পের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন দাপুটে কর্মকর্তারা। তারা জয়বাংলার শ্লোগানে বিশ্বাসী হলেও বর্তমান খোলস পাল্টিয়ে ফেলেছেন। কেউ নিজেকে বিএনপি কেউবা আবার নিজেকে জামায়াতপন্থী হিসেবে প্রচারে মগ্ন হয়ে আছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে গত ১৬ বছর ধরে গড়ে উঠা লুটপাটের সহযোগী বিগত সরকারের কর্মকর্তাদের বিতাড়িত করার কার্যকর পদক্ষেপ শুরু করেছে সরকার।
কিন্তু মাঝখানে এসে মন্ত্রণালয় থমকে যায় অধিদপ্তরের সিন্ডিকেটের হাতে। এখনোও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদেরকে বদলি করতে পাছেন না অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়। তারা এখনও বহাল তবিয়তে অফিস করছেন। কেউ বা বছরের পর বছর পোস্টিং নিজের পছন্দ্র যায়গায় । তাও আবার গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ বা ঘুরেফিরেই আবার ঢাকায় বদলি হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, ফ্যাসিবাদের দােসর কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে তারা মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করে ফেলছেন। শেখ হাসিনার পতনের এক বছরেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। প্রকল্প থেকে লুটের টাকায় তারা সব ম্যানেজ করে ফেলেছেন বলে সূত্র জানায়। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পদত্যাগ করে দিল্লি পলায়নের পর দেশের অন্য সব সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তরের ন্যায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেও চলছে চরম বিশৃঙ্খলা।
এর নেপথ্যে কাজ করছেন শেখ হাসিনার মদদপুষ্ট কতিপয় কর্মকর্তা। তাদের মদদ দিচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কর্মরত আওয়ামীপন্থী এবং সাবেক কৃষি মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এর দালাল ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা । এই দালাল কর্মকর্তারাই বিভিন্ন প্রকল্পের পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে সাবেক মন্ত্রী সাবেক কৃষি মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদেরকে কোটি টাকা ঘুষ দিতে যারা ব্যর্থ হয়েছেন, সেসব কর্মকর্তারা যোগ্যতা ও সিনিয়রিটি থাকা সত্ত্বেও তাদের অনেককে করা হয়েছে ওএসডি, অনেককেই পাঠানো হয়েছে দূর্গম ও রুগ্ন জেলাগুলোতে।
অপরদিকে শেখ মুজিবের পূজারী হয়েও বাছিরুল আলমের মতো দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পাচ্ছেন প্রাইজ পোষ্টিং।
অভিযোগ রয়েছে তিনি জুলাই আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ বাছিরুল আলম গভীর রাত পর্যন্ত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডারদের সাথে শলাপরামর্শে লিপ্ত থাকতেন। এছাড়া ছাত্র জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করতে ওইসব ক্যাডারদের তিনি লাখ লাখ টাকা তুলে দেন বলে জনশ্রুতি আছে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার কৃষকরা যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানামুখী সংকট মোকাবিলায় লড়ছেন, তখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দের প্রায় প্রতিটি খাতে নয়ছয় এবং অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি দুর্নীতির চাষাবাদে মজেছেন- এমনটাই বলছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
সবজি বীজ বিতরণে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্ব বিরত চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরার সঙ্গে যোগসাজশে শীতকালীন সবজি বীজ বিতরণের নামে ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। গত বছরের শেষ দিকে শীতকালীন সবজি উৎপাদনে সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলা সদরসহ ৯ উপজেলার ৮ হাজার কৃষকের মাঝে হাইব্রিড বীজ বিতরণের উদ্যোগ নেয় কৃষি অধিদপ্তর। অভিযোগ পাওয়া গেছে, একটি কোম্পানির সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ১ হাজার ২৫০ টাকায় কেনা বীজের মূল্য ১ হাজার ৮০০ টাকা দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বাছিরুল আলম এবং জেলা পরিষদের দায়িত্ব বিরত চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা। এতে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার মধ্যে ৪৪ লাখ টাকাই বেহাত করেছেন তারা।
গোপন একটি সূত্র জানায়, বাছিরুল আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কয়েকজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সহায়তায় পুরো লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল। অথচ জেলা পরিষদের তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর-২০০৬ ও ২০০৮) অনুযায়ী বীজ কেনার জন্য দাপ্তরিক নির্দেশনা দিলেও তা উপেক্ষা করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বীজ কেনার জন্য একটি কৃষি পুনর্বাসন কমিটি রয়েছে। পদাধিকার বলে কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা এবং সদস্যসচিব ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাছিরুল আলম। এ ছাড়াও জেলা পরিষদের সদস্য কংজপ্রু মারমা যাবতীয় বিষয় দেখভালের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। তবে বীজ কেনা এবং বিতরণের বিষয়ে কোনো কিছুই অবগত নন বলে জানিয়েছেন তিনি।
পেঁয়াজ ও অড়হর বীজ বিতরণেও নয়ছয়
গত মৌসুমে শীতকালীন পেঁয়াজ প্রদর্শনীতে প্রতি কেজি ৬ হাজার টাকায় কেনা বীজের অর্ধেক বিতরণ করে বাকি অংশের টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ উঠেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। ১৮টি প্রদর্শনীর জন্য প্রতিটি প্রদর্শনীতে ১ কেজি বীজ বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও কৃষকদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫০০ গ্রাম করে। এই খাতেও ৫৪ হাজার টাকা লোপাট হয়েছে।
বীজ পাওয়া কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের ৫০০ গ্রাম বীজ দেওয়া হলেও কেউ জানতে চাইলে ১ কেজি বীজ পেয়েছেন বলে জানানোর কঠোর নির্দেশনা দেন কৃষি কর্মকর্তারা। তা না হলে পরে আর কোনো ধরনের সহায়তা পাবেন না- এমন হুমকি দেওয়া হয় কৃষকদের।
শুধু তাই নয়, বীজ সহায়তা প্রকল্পে কাগজে-কলমে ১৭ জন কৃষকের নামে ১ কেজি করে পেঁয়াজ বীজ বিতরণ দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো কৃষককেই পেঁয়াজের বীজ দেওয়া হয়নি বলে অধিদপ্তরের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে। আর এতে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার টাকা। অপরদিকে অড়হর কর্মসূচিতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মসূচির আওতায় প্রতিজন কৃষক ২ কেজি করে বীজ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কৃষকদের দেওয়া হয়েছে এক কেজি বা তারও কম। মাঠপর্যায়ে এখনো চলছে বিতরণের নামে এমন ভেলকিবাজি।
৩ দিনের ট্যুর ১ দিনে শেষ করে অর্থ আত্মসাৎ
পারিবারিক পুষ্টিবাগান প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বাছিরুল আলমের বিরুদ্ধে। গত বছরের ডিসেম্বরে ৩০ জন কৃষকের জায়গায় ২০ জনকে নিয়ে ৩ দিনের মোটিভেশনাল ট্যুর মাত্র ১ দিনে শেষ করে মোটা দাগে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
গুইমারা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন কান্তি নাথ ও পানছড়ি উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জমির উদ্দিনসহ ওই মোটিভেশনাল ট্যুরে অংশ নেওয়া অন্য কৃষি কর্মকর্তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বীকার করেছেন, মোটিভেশনাল ট্যুরটি দিনে দিনে শেষ করে মাস্টাররোলে তিন দিনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। তবে এর বেশি আর কিছু বলতে রাজি হননি ট্যুরে অংশ নেওয়া কৃষি কর্মকর্তারা।
৪০ লাখ টাকার কৃষিযন্ত্র গায়েব
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউএনডিপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খাগড়াছড়ির চারটি উপজেলার জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্র কেনা হয়। তবে বাছিরুল আলম ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক এক মাস আগে পানছড়ি উপজেলার রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্রটি গায়েব হয়ে যায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, খাগড়াছড়ি আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা খগেন্দ্র ত্রিপুরার সঙ্গে যোগসাজশে কৃষকদের জন্য কেনা রাইচ হার্ভেস্টার যন্ত্র বিক্রি করে অর্থ লোপাট করেছেন বাছিরুল আলম। ৪০ লাখ টাকার ওই কৃষিযন্ত্র এক বছর ধরে গায়েব। অথচ রহস্যজনক কারণে এ বিষয়ে একেবারেই নির্বিকার কৃষি বিভাগ ও জেলা পরিষদ।
ঢাকায় জমি, বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট
এত সব অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছে বাছিরুল আলমের বিত্তবৈভবের বিস্তার। ঢাকার মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি, উত্তরা এলাকায় কোটি টাকার প্লট, জমি ও ব্যক্তিগত দামি গাড়ি রয়েছে তার- এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে।
এ বিষয়ে জানতে, কৃষি কর্মকর্তা বাছিরুল আলমের ল্যান্ড ফোন ও তার হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেওয়া হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে ন্যস্ত। আর পদাধিকার বলে কৃষি পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক হলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। এতসব অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্বরত চেয়ারম্যান ও কৃষি পুনর্বাসন কমিটির আহ্বায়ক জিরুনা ত্রিপুরার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সদস্য ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আহ্বায়ক কংজ্যপ্রু মারমা বলেন, ‘আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও বীজ কেনার বিষয়ে কিছুই জানা নেই আমার। তবে মোটিভেশনাল ট্যুরে তিন দিনের প্রশিক্ষণ এক দিনে শেষ করার অভিযোগটি আমিও শুনেছি। এর বাইরে আপাতত কিছুই বলতে চাইছি না।’
এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে সচেতনমহল মনে করেন।
দুর্নীতিগ্রস্থ এই কর্মকর্তা এখনো কীভাবে গড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন তা খতিয়ে দেখতে দুদকের কঠোর হস্তক্ষেপসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় উপদেষ্টার সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সচেতন মহল।
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :