
রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব জনগণের সেবা, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরেই গজিয়ে ওঠে দুর্নীতির জাল, তখন প্রশ্ন উঠে—এই যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী কে? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজকের দিনে অনেক রাষ্ট্রই দুর্নীতিবাজদের কাছে একরকম পরাজিতই হয়ে পড়ছে। ন্যায়, জবাবদিহিতা আর স্বচ্ছতা যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র যেখানে বিশাল, শক্তিশালী এবং সম্পদে পরিপূর্ণ, সেখানে কিছু ব্যক্তি কিভাবে এতটা ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে যে রাষ্ট্রকেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে?
দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ভেতর থেকে তাকে ক্ষয় করে দেয়। প্রশাসনের উচ্চস্তর থেকে নিচ পর্যন্ত যখন ঘুষ, অনিয়ম ও অপচয়ের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে, তখন সৎ কর্মকর্তা এক প্রকার কোণঠাসা হয়ে যান। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, এবং জনগণের সীমিত অংশগ্রহণ দুর্নীতিকে করে তোলে আরও বেপরোয়া। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা জানেন—তাদের ধরার কেউ নেই। বরং তারা ‘চক্রবদ্ধ নিরাপত্তা’ উপভোগ করেন—উপরের তলা থেকে নিচ পর্যন্ত একে অন্যকে রক্ষা করে চলে।
রাষ্ট্র হারছে, কারণ রাষ্ট্র তার নৈতিক শক্তি হারাচ্ছে। যখন দুর্নীতি প্রকাশ পায়, তখন রাষ্ট্র হয় মুখ ফিরিয়ে নেয়, না হয় সাময়িক শাস্তির ভান করে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এই ‘দেখানোর শুদ্ধি অভিযান’ কার্যত দুর্নীতিকে নির্মূল করে না, বরং তা নতুন রূপে আবার ফিরে আসে।
তবে সবকিছু অন্ধকার নয়। রাষ্ট্র যদি চায়, তবে সে-ই সবচেয়ে শক্তিশালী। সঠিক নেতৃত্ব, স্বাধীন ও সাহসী গণমাধ্যম, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
রাষ্ট্রকে তার চেতনাগত ভিত্তিতে ফিরিয়ে নিতে হবে—যেখানে সেবা, স্বচ্ছতা ও শাসনের নীতি থাকে অটুট। আর জনগণকেও চোখ কান খোলা রাখতে হবে—কারণ একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র একদিনে তৈরি হয় না, কিন্তু প্রতিদিন চেষ্টা না থাকলে সেটা আর কখনও তৈরি হবে না।
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :