বিদেশে বসে ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি পরিচয় দেয়া সন্ত্রাসী মামুনের নির্দেশে যুবদল নেতা কিবরিয়াকে হত্যা


স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৯, ২০২৫, ১০:৫১ পূর্বাহ্ন /
বিদেশে বসে ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি পরিচয় দেয়া সন্ত্রাসী মামুনের নির্দেশে যুবদল নেতা কিবরিয়াকে হত্যা

ঢাকার মিরপুর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়ার হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় একটি চক্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্য-সংঘাত ও পাওনা লেনদেনকে কেন্দ্র করে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এলাকাবাসী ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, কয়েক বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান ওরফে মামুন বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করে এ হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন।

সোমবার সন্ধ্যায় মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ‘বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি’ দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন কিবরিয়া (৪৭)। ঠিক সে সময় মুখোশ পরা তিন সশস্ত্র ব্যক্তি হঠাৎ দোকানে ঢুকে খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। দ্রুত বেরিয়ে অটোরিকশায় ওঠার সময় চালক দ্রুতগতিতে না চালানোয় তাঁকেও গুলি করে আহত করা হয়।

ঘটনার পর স্থানীয়রা একজনকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন, যিনি পরে পরিচয় দেন জনি ভূঁইয়া (২৫) নামে। পুলিশ বলছে, জনিসহ আরও কয়েকজনকে ভাড়া করে আনা হয়েছিল।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, আটক জনি ইতোমধ্যেই হত্যায় তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ভাড়া করা খুনিদের দল হিসেবে তারা কাজ করেছে, আর কাদের নির্দেশে এসেছে তাও তদন্তকারীরা শনাক্ত করেছেন।

পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলায় জনি ভূঁইয়াসহ পাঁচজনের নাম রয়েছে। এছাড়া আরও সাত আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে ঘটনাটিতে জড়িত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি সূত্র বলছে, এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও দখল বাণিজ্য দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করতেন মামুন ও তাঁর ভাই মশিউর ওরফে মশি, যিনি বর্তমানে ভারতে বলে জানা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মামুন বিদেশে বসে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন।

কিবরিয়া এতে বাধা দিচ্ছিলেন, বিশেষ করে এলাকায় মামুনের লোকজনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দেওয়া, দলীয় কমিটিতে স্বজনপ্রীতির চাপ প্রত্যাখ্যান করা, পুরোনো আর্থিক পাওনা পরিশোধে অস্বচ্ছতার অভিযোগে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কিবরিয়ার ওপর ক্ষোভ বাড়ছিল বলে দুই পক্ষেরই ধারণা।

তথ্য অনুযায়ী, পল্লবী থানায় মামুনের বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা, ১৫টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং দুটি সাজা পরোয়ানা রয়েছে। কয়েকটি মামলায় তাঁকে যাবজ্জীবন দণ্ডও দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়েই মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান তিনি। এরপর থেকে বিদেশ থেকেই এলাকায় ‘তদারকি ও নির্দেশ’ দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ।

ঘটনাস্থল মিরপুর-পল্লবীর বিভিন্ন সড়কে আজও দেখা গেছে মামুনকে ‘৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি’ পরিচয়ে লাগানো পোস্টার। বিএনপির একজন স্থানীয় নেতা জানিয়েছেন, এ পোস্টার তুলে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বরের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার শয্যাশায়ী অবস্থায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। দুই কন্যা ও স্বজনেরা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন।

কিবরিয়ার ভাই গোলাম কবির জানান, ২০১৪ সালেও বাড়ির কাছে সন্ত্রাসীরা তাঁকে গুলি করেছিল। সেই হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি, পুলিশও কোনো ফলাফল দিতে পারেনি। এবারও বোঝার উপায় নেই কোন স্বার্থে তাঁর ভাইকে টার্গেট করা হলো।

হাসপাতালের মর্গে লাশ নেওয়ার সময় কিবরিয়ার শ্যালিকা জানান, তিনি প্রতিদিনের মতোই বন্ধুর দোকানে আড্ডা দিতে গিয়েছিলেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজ বলেন, আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক কর্মীরা গা ঢাকা দিয়ে থাকতাম। এখন অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক মাঠে নানা রঙের লোক ঢুকে পড়েছে সন্ত্রাসী, সুবিধাবাদী, মাফিয়া। তারই শিকার কিবরিয়া।

তিনি আরও বলেন, অতীতেও পল্লবীতে বিএনপি-ছাত্রদল নেতাদের উপর হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। এবার আবারো সেই চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

পল্লবী জোনের ডিসি জানান, ঘটনায় জড়িতদের মূল পরিকল্পনাকারী এবং বিদেশে অবস্থানকারী ব্যক্তিসহ সবাইকে আইনের আওতায় আনার জন্য অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

You cannot copy content of this page