ভাষা সৈনিক শামছুল হক কলেজে অচলাবস্থা: শিক্ষার চেয়ে দ্বন্দ্বে বেশি, সরকারি অর্থ অপচয়


মিয়া সুলেমান, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৭, ২০২৫, ১০:৫৯ অপরাহ্ন /
ভাষা সৈনিক শামছুল হক কলেজে অচলাবস্থা: শিক্ষার চেয়ে দ্বন্দ্বে বেশি, সরকারি অর্থ অপচয়

ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার পাথারিয়া গ্রামে অবস্থিত ভাষা সৈনিক শামছুল হক কলেজে চলছে অচলাবস্থা। শিক্ষক, জমিদাতা ও অধ্যক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে শিক্ষার্থীরা পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। প্রায় ছয় মাস ধরে কলেজের অধ্যক্ষ মো. মনিরুজ্জামান মূল ক্যাম্পাস ছেড়ে নিজের বাড়ির পাশে টিনের ঘরে আলাদা করে ক্লাস নিচ্ছেন। এতে কলেজ কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে এবং শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

২০১৪ সালে প্রায় ৪০ কাঠা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ কলেজটি গত বছরের অক্টোবরে এমপিওভুক্ত হয়। এমপিওভুক্তির পর থেকেই শুরু হয় শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিরোধ। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, অধ্যক্ষ নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন এবং যারা তাঁর নির্দেশ মানছেন না, তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দিয়েছেন।

জমিদাতা গিয়াস উদ্দিন সরকার বলেন, “অধ্যক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে কলেজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ করেছেন এবং এখন নিজ বাড়ির পাশে টিনের ঘর তুলে আলাদা কলেজ চালাচ্ছেন— যা সম্পূর্ণ বেআইনি।”

অভিযোগ উঠেছে, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার পর থেকেই অধ্যক্ষ মূল ক্যাম্পাসে যাওয়া বন্ধ করেন। এরপর নিজের বাড়ির পাশে ফসলি জমির মধ্যে টিনের দোচালা ঘর নির্মাণ করে সেখানে ক্লাস শুরু করেন। এখন সেই অস্থায়ী ঘরে জাতীয় পতাকা উড়ছে, যদিও সেখানে ক্লাস করছে মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী।

নিয়োগ বোর্ডের সদস্য শাহাদাৎ হোসেন বলেন, “বোর্ডের বাইরে গিয়ে অধ্যক্ষ টাকার বিনিময়ে একাধিক শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। আমরা প্রতিবাদ করায় তিনি মূল ক্যাম্পাস ছেড়ে নিজস্ব ভবনে ক্লাস নিচ্ছেন।”

শিক্ষক মোখলেছুর রহমান বলেন, “আমি নিয়মিত মূল ক্যাম্পাসে ক্লাস নেই। কিন্তু অধ্যক্ষের নতুন ভবনে না যাওয়ায় আমার বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

বলা হচ্ছে, কলেজে বাণিজ্য বিভাগে কোনো শিক্ষার্থী না থাকলেও তিনজন প্রভাষক এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে অফিস সহকারী পদে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এসব নিয়ে স্থানীয়ভাবে মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে।

অধ্যক্ষ মো. মনিরুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চলছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে আমি নিজ বাড়ির পাশে ক্লাস নিচ্ছি। এলাকাবাসীর সম্মতিতেই এটি করেছি।”

তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসাইন বলেন, “উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু আপসে সমাধান হয়নি। বিষয়টি তদন্তের জন্য শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

ময়মনসিংহ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর এ. কে. এম. আলিফ উল্লাহ আহসান জানান, “বোর্ডের অনুমতি ছাড়া অধ্যক্ষের এভাবে আলাদা স্থানে ক্লাস নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। আগামী ১৭ নভেম্বর উভয় পক্ষকে ডাকা হয়েছে। আমি নিজেও উপস্থিত থাকব।”

দ্বন্দ্বের ফলে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। তারা বলছে, “একাংশ এক ভবনে, অন্যরা অন্য ভবনে ক্লাস করছে। এতে মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, পড়াশোনায় আগ্রহ কমছে। আমরা চাই কলেজে আবার ঐক্য ফিরে আসুক।”

You cannot copy content of this page