বেনাপোল বন্দর থমকে গেল: সন্ধ্যা ৬টার পর আমদানি-রপ্তানি বন্ধ, কোটি কোটি টাকার ক্ষতি


শাহারুল ইসলাম ফারদিন, বিশেষ প্রতিনিধিঃ প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৬, ২০২৫, ৫:২৮ পূর্বাহ্ন /
বেনাপোল বন্দর থমকে গেল: সন্ধ্যা ৬টার পর আমদানি-রপ্তানি বন্ধ, কোটি কোটি টাকার ক্ষতি
বেনাপোল স্থলবন্দর, দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র। সকাল থেকেই বন্দর প্রাণচঞ্চল, ট্রাকের গর্জন, কাগজপত্রের তৎপরতা, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকের দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টা বাজতেই হঠাৎ কাস্টমসের নির্দেশে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে বন্দর কার্যক্রমে তৈরি হয় অচলাবস্থা, যার প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সরকারের ওপর। বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তে আটকে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার ট্রাক, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বেনাপোল বন্দর পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ‘আমরা বন্দর পরিচালনা করি, কিন্তু কাস্টমস অনুমোদন ছাড়া কোনো পণ্য ক্লিয়ার করা সম্ভব নয়। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে রাজস্ব এবং বাণিজ্য, উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০-২৫০ কোটি টাকার পণ্য বন্দর দিয়ে চলাচল করে। যে ট্রাকগুলো আটকা পড়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে দ্রুত পচনশীল ফল, মাছ, সবজি এবং কসমেটিকস। যদি এগুলো সময়মতো খালাস না হয়, তবে শুধু ব্যবসায়ীর আর্থিক ক্ষতি নয়, সরকারের রাজস্বও প্রতিদিন প্রায় ৫-৭ কোটি টাকা হারাচ্ছে।’
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক লতা বলেন, ‘সন্ধ্যার পর কার্যক্রম বন্ধ করার কোনো পূর্ব ঘোষণা ছিল না। শত শত ট্রাক দুই পাশে আটকে আছে, ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে। এই ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত বেনাপোল বন্দরের ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে হিলি বা সোনামসজিদ বন্দরে চলে যাবে, যা সরকারের রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের ধাক্কা দেবে।’
এক আমদানিকারক ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমরা দিনশেষে পণ্য নামিয়ে ডেলিভারি নিশ্চিত করতে চাই। কিন্তু হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ট্রাক জট তৈরি হয়েছে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, তবে কোনো সমাধান পাইনি। প্রতিদিনের লসই কোটি কোটি টাকা, এটি শুধু ব্যবসায়ীর নয়, সরকারেরও বড় ক্ষতি।’
শ্রমিক নুরুল হক বলেন, ‘সন্ধ্যার পর কাজ বন্ধ হলে আমাদের দৈনিক আয় কমে যায়। পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ট্রাকে বসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, খাবার ও পানির সংকট তৈরি হয়। প্রশাসন চাইলে এই পরিস্থিতি শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে পারত।’
চালক মনির হোসেন বলেন, ‘একটা কাগজ বাকি ছিল, মনে হয়েছিল আজ পণ্য নামিয়ে ফিরব। হঠাৎ সব বন্ধ। রাতের অন্ধকার, রোদ-বৃষ্টি, সব কিছুতে ট্রাকে বসে থাকতে হচ্ছে। প্রতিদিনের এই ধাক্কা মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে।’
ভারতের পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাদেশের একতরফা সিদ্ধান্তে ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত। সীমান্ত বন্ধ থাকায় ডেলিভারি শিডিউল ঠিক রাখা সম্ভব নয়। দুই দেশের বাণিজ্য বিশ্বাসের সংকটে পড়েছে। ভারতের বহু ব্যবসায়ী রপ্তানি-আমদানিতে ক্ষতির মুখে।’
কাস্টমস কমিশনার খালিদ মো. আবু হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কাস্টমসের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন,  ‘অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সমন্বয়ের কারণে সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা চাই শৃঙ্খলা বজায় থাকুক, তবে দ্রুত সমাধান করা হবে।’
২০১৭ সালে বেনাপোল-পেট্রাপোল আইসিপি ২৪ ঘণ্টা খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের সব কাস্টমস হাউসকে রাত ১২ পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে বাস্তবে বেনাপোলে তা কার্যকর হয়নি। আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। একতরফাভাবে সময়সীমা কমানো হয়েছে। এতে ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সরকার—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

You cannot copy content of this page