
নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার অফিস যেনো অনিয়ম-দূর্নীতি, টেম্পারিংজালিয়াতি ও ঘুষবাণিজ্যর হেরেম খানায় পরিনত হয়েছে! সিন্ডিকেট করে আদায় করা হয় লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ, এই সিন্ডিকেটের প্রধান চরিত্রে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা রেজিস্ট্রারের প্রধান সহকারী ওরফে বড় বাবু আওয়ামী দোসর, ভারতে টাকা পাচারকারী পলাশ কুমার বিশ্বাস। নেপথ্যে ভূমিকায় রয়েছেন নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল মোতালেব।
নাটোর সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, জমির ক্রেতা-বিক্রেতা, দলিল লেখক আর দালালের প্রচণ্ড ভিড় ভেতরে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দালালেরা নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে সহজেই জমি নিবন্ধনের কাজ করিয়ে দেন। কাগজপত্রে সমস্যা থাকলেও ঠিকমতো যাচাই করা হয় না। আর দালাল ছাড়া গেলে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় সদর উপজেলার সাব- রেজিস্ট্রার অফিসে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালের উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারি কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে দলিল লেখক ও দালাল চক্ররা তাদের অপকর্ম প্রকাশ্যে চালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নিরব দর্শকের ভূমিকায়। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণে সদর উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার অফিসের কার্যক্রম।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, এ ধরনের অনিয়ম জালিয়াতির হোতা নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল মোতালেবের
সিন্ডিকেটভুক্ত নাটোর সদরের টিসি মোহরা ও নাটোর জেলা রেজিস্ট্রারের প্রধান সহকারী পলাশ কুমার বিশ্বাসের মাধ্যমে দাতা গ্রহীতারা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ । দলিল সম্পাদন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জমির মূল জমা খারিজ খতিয়ান সাব রেজিঃ অফিসারের নিকট প্রদর্শন করার কথা থাকলেও তা না দেখিয়ে টাকার জালে আবদ্ধ করে রাখে। রেজিঃ দলিল সম্পাদন করার সময় দাতা এবং গ্রহীতা উভয় পক্ষের উপস্থিত থাকার সরকারি নিয়ম থাকলেও উক্ত সিন্ডিকেটের কারণে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। তারা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কোন এক পক্ষ উপস্থিত না হলেও দলিল সম্পাদনের কাজ সম্পন্ন করিয়ে দেয়।
অনেক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিয়মিত সাব রেজিস্ট্রার অফিসে না থাকার দরুন সাহেবের ইচ্ছামত অফিসে এসে রেজিস্ট্রার কবলা সম্পাদন করেন। একজন গ্রাহক থেকে দলিল মূল্যের ১ থেকে ২ পার্সেন্ট টাকা করে দলিল লেখক এর মাধ্যমে সমিতিসহ অফিস খরচ এবং নাটোর জেলা রেজিস্ট্রারের কমিশনের নামে আদায় করে নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে ।
নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল মোতালেব ঘুষ দুর্নীতি আর দলিল বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড। এতে করে প্রতিদিন তার অধিনে থাকা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস গুলো থেকে দিনে কালেকশন হয় ১০ লাখ টাকা। মাসে বা ২২ কর্মদিবসে তার মিনিমাম উপরি ধান্দা হয় আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকা। দলিল প্রতি সাধারণভাবেই তাকে দিতে হয় ৫০০ টাকা করে। এ হিসেবে সন্ধ্যার পরপরই তার ঝুলিতে প্রতিদিন জমা পড়ে ১০ লাখ টাকা করে। এসব টাকা আসে তার অধিনস্ত নাটোর সদর, সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর, বাগাতিপাড়া ও নলডাঙ্গা সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে। এর বাইরেও তার অনেক কালো টাকার উৎস আছে। জমির পর্চায় ভুলভ্রান্তি, আইডি কার্ডে বানান ভুল ও অন্যান্য সামান্য সমস্যা থাকলেই তিনি সেসব জমি দাতা গ্রহীতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। মানে টাকাই এখানে শেষ কথা। টাকা ছাড়া মেলেনা সেবা, নড়েনা ফাইল।। এর বাইরেও আছে বছরে অতিরিক্ত ৫ কোটি টাকার বিশেষ মিশন। সেসব টাকা আসে, অফিস স্টাফ বদলি, বিদেশ ভ্রমণ, পদোন্নতি, কাজী ও দলিল লেখকদের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, জাল দলিল সম্পাদনসহ নানারকমের ধান্দা ফিকির। আর এভাবেই ঘুষ দুর্নীতি আর জাল দলিল বাণিজ্যের কারবারে তিনি এখন শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক।

জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে তার প্রথম পদায়ন হয় চুয়াডাঙ্গায়। সেখানে ৪ টি সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকেই তিনি দুহাতে লুটে নেন কড়কড়ে টাকার বান্ডিল। আমাদের চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা জেলা রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আব্দুল মোতালেবকে ৯ই সেপ্টেম্বর ২০২৪ মঙ্গলবার ঘুষসহ হাতে-নাতে ধরে উত্তম-মধ্যম দিয়েছিলেন সাধারণ জনগণ। গতকাল মঙ্গলবার এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। সেসব কলঙ্ক চাপা দিতে জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল মোতালেব একটি মামলানকরলেও ভুক্তভোগীরা করে দুটি পৃথক মামলা।
সূত্রের খবর, চুয়াডাঙ্গা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে মোহাম্মদ আব্দুল মোতালেব ২০২৩ সালের ১৩ জুন দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেয়ার শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে ওঠে নানা অভিযোগ। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও জেলা রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আব্দুল মোতালেবের ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি একাধিকবার উঠে এসছে বলে জানান আমাদের প্রতিনিধি বিশাল রহমান।
চুয়াডাঙ্গায় অভিযোগ উঠেছিলো যে, নিজ মাধ্যমে তো বটেই, প্রত্যেক সাব-রেজিস্ট্রারদের কাছ থেকেও তিনি মাসিক ১০ লাখ টাকা করে আদায় করতেন। ফলে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ মঙ্গলবার এই কর্মকর্তার শেষ কর্মদিবস ছিল চুয়াডাঙ্গায়। অফিসে বিদায় সংবর্ধনারও আয়োজন করা হয়েছিল। তবে তার বিদায়ের খবর পেয়ে সাধারণ জনগণ জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে যায় বলে জানা যায়। সেখানে তারা বিদায়ের দিনেও জেলা রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আব্দুল মোতালেবকে ঘুষের টাকা গুণে নিতে দেখেন। উত্তেজিত সাধারণ জনগণ এসময় উত্তম-মধ্যম দেন ওই কর্মকর্তাকে। এরপর ঘুষের টাকা সাধারণ জনগণ পুলিশের হাতে তুলে দেন বলে জানা যায়।
বর্তমানে দুর্নীতিবাজ জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল মোতালেব এর ঘুষ দুর্নীতি আর জাল জালিয়াতির কারণে অতিষ্ঠ গোটা নাটরবাসী।।
আমাদের নাটোর প্রতিনিধি জানান, প্রতিদিন অফিস শেষে বাসায় যাওয়ার সময় জেলা রেজিস্ট্রার ও তার সহকারীর ব্যাগ তল্লাশী করলেই ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে এদেরকে আটক করা সম্ভব।।
এ বিষয়ে নাটোরের সচেতন মহল দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার অপসারণ ও কালো টাকার অবৈধ সম্পদের হিসেবের দাবিতে দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম ও আইজিআর মহোদয়ের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।।
পুনশ্চঃ ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আব্দুল মোতালেব টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৩ ই জুন ২০২৩ জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে তার প্রথম কর্মস্থল ছিলো চুয়াডাঙ্গা। ২০৩২ সালের ৩০ শে নভেম্বর তার পিআরএল শুরুর কথা রয়েছে। তবে তিনি যেভাবে ঘুষ দুর্নীতি ও লুটপাট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন, তাতে করে পরবর্তী ৭ বছর তিনি জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে স্বাচ্ছন্দ্যে কর্মকাল অতিবাহিত করতে পারবেন কি-না সে সংশয় দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করার জন্য একাধিক বার জেলা রেজিস্ট্রার সহকারী ওরফে বড় বাবু পলাশ কুমার বিশ্বাস বা জেলা রেজিস্ট্রারআব্দুল মোতালেব কেউ ই ফোন রিসিভ করেননি। বহু প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত ৫ই আগষ্টের পর বৈষম্যেমুক্ত বাংলাদেশে ঘুষ ও দূর্নীতির বরপূত্র এই সমস্ত অফিসারদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত পূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে নাটোর জেলাবাসী।
You cannot copy content of this page
আপনার মতামত লিখুন :