খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদের রমরমা বদলি বাণিজ্যঃ আতঙ্কে খুলনার খাদ্য কর্মকর্তারা

নিজ ইচ্ছায় চাকরি ছাড়ার আবেদন করে ফের খাদ্য বিভাগের শীর্ষ পদে দখল করে বসে আছেন খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ। তবে তার যোগদানের পর থেকেই খুলনা বিভাগজুড়ে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, পূনর্বাসনের পরপরই তিনি বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে শুরু করেছেন ব্যাপক আর্থিক লেনদেনভিত্তিক বদলি বাণিজ্য। এছাড়া ছাত্রলীগ ক্যাডার পদায়নসহ নানা অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে।

সূত্র বলছে, খুলনার ১০ জেলার ৭৮টি খাদ্য গুদামে পরিদর্শনের নামে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বদলির ভয় দেখিয়ে গুদাম কর্মকর্তাদের জিম্মি করা, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে নিয়ম ভেঙে অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়াসহ বিস্তর অভিযোগ ইতোমধ্যেই উচ্চ মহলে পৌঁছেছে।

২০২০ সালে সিলেটের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক থাকাকালীন হঠাৎ করেই স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়েন মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ। কিন্তু ২০২৫ সালে ফের তাকে পদায়ন করা হয় চট্টগ্রামে। যোগদান করতে গিয়ে সেখানে কর্মরত কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে ফিরে আসতে হয়। এরপর ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে খুলনায় পদায়ন করা হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তিনি খুলনায় যোগ দেন। যোগদানের পরপরই খুলনার প্রতিটি জেলায় খাদ্য গুদাম পরিদর্শনে গিয়ে গুদাম কর্মকর্তাদের কাছে চাঁদা দাবি করেন মামুনুর রশিদ। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই তাকে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে। বদলির জন্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও যশোর জেলার দুই কর্মকর্তা মামলার বলি হয়ে বদলি

নওয়াপাড়া খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ রবিউল ইসলামকে মেয়াদপূর্তির আগেই গত ১০ সেপ্টেম্বর বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, মিডিয়ায় প্রচারিত এক ভিডিও সংক্রান্ত, যার তদন্ত কমিটির রিপোর্টে তাকে ক্লিনশিট দেওয়া হয়। তবুও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার জায়গায় যিনি নিয়োগ পেয়েছেন, মোঃ আকতারুজ্জামান, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত এবং তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর হতে পাঠানো তদন্ত চলমান। এমনকি বড় রকমের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আকতরুজ্জামানকে পদায়নের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আরেকজন, মনিরামপুর গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মতিয়ার রহমান, মাত্র ৮ মাসের ব্যবধানে বদলির শিকার হন বিতর্কিত স্লোগানযুক্ত বস্তা বিতরণের অভিযোগে। অথচ সেই স্লোগান (শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ) ছিল পুরনো সরকারের সময় মজুদ করা বস্তায়। এ কারণে মোঃ মতিয়ার রহমানকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, যশোর সেফাউর রহমান ব্যাখ্যা তলব করেন এবং তিন দিনের ভিতর ব্যাখ্যার জবাব দিতে বলেন কিন্তু তিন দিন হওয়ার আগেই তিনি মতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক খুলনা বরাবর চিঠি দেন। আর্থিক লেনদেন মনঃপূত না হওয়ায় এমনটি করা হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকের ধারণা। কিন্তু তৎকালীন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জনাব ইকবাল বাহার চৌধুরী এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে জনাব মোঃ মতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

তবে বর্তমান আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জনাব মামুনুর রশিদ তার যোগদানের তিন মাস আগের বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কারণ দেখিয়ে কোন তদন্ত ছাড়া বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে জনাব পলাশ আহমেদকে মনিরামপুর খাদ্য গুদামে পদায়ন করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, জনাব পলাশ আহমেদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। ব্যক্তি জীবনে তিনি কুতুবপুর ইউনিয়নের নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে দুইটি মামলা হয়েছে। তিনি কুতুবপুর ইউনিয়নের আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান মানিকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।

বিতর্কিত স্লোগানযুক্ত বস্তার দায় নিচ্ছেন না কর্তৃপক্ষ

‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ লেখা স্লোগানযুক্ত বিতরণ বস্তা নিয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। অথচ এই বস্তাগুলো সরবরাহ হয়েছিল পুরনো সরকারের আমলে। সে সময় সরকারি খাদ্য গুদামে প্রায় ১৫ লক্ষ মেট্টিক টন চাল মজুদ ছিল। এই চাল যদি ৩০ কেজি ধারণক্ষমতার বস্তায় মজুদ করা হয়, তাহলে প্রায় ৫ কোটি বস্তার প্রয়োজন হয়। এছাড়াও গুদামগুলোতে লক্ষ লক্ষ খালি বস্তা মজুদ ছিল। ৩০ কেজি ধারণক্ষমতার সকল বস্তায় বিতর্কিত স্লোগান ছিলো। ৫ আগস্টের পরে খাদ্য বিভাগ এই স্লোগানযুক্ত বস্তা নিয়ে বিতর্কে পড়ে। খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয় এই স্লোগানযুক্ত বস্তার দায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অর্থাৎ গুদাম কর্মকর্তাদের ওপর দিয়ে নিজের পিঠ বাঁচায়। তারা নির্দেশনা দেন, অমোচনীয় কালি দিয়ে স্লোগান মুছে খাদ্যশস্য বিতরণ করতে হবে।

এছাড়া খাদ্যশস্য বিলি-বিতরণের সময় এতো বিপুল সংখ্যক বস্তার স্লোগান শতভাগ কালি দিয়ে মুছে বিতরণ করা প্রায় অসম্ভব। অনেক চেষ্টার পরও দুয়েকটি বস্তা বাদ পড়ে যায়, তাতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর খড়গ নেমে আসছে। তার সর্বশেষ বলি মনিরামপুর খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা মোঃ মতিয়ার রহমান।

কয়েকজন খাদ্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পেয়েছে এই প্রতিবেদক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খাদ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ রশিদ রবিউল ও মতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন। আগের খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইকবাল বাহার এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাননি। আর মতিয়ার রহমানকে সামান্য কারণেই বদলি করা হয়েছে। এতে সবার মাঝে বদলি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আর খাদ্য গুদাম পরিদর্শন শেষে টাকা নেওয়ার কথা আমরাও শুনেছি। কেউ বলছে ৫০ লাখ আবার কেউ এর থেকে বেশিও বলছেন।’

মনিরামপুর গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মতিয়ার রহমানকে বিতর্কিত স্লোগানযুক্ত বস্তা বিতরণের অভিযোগে জানতে চাইলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সেফাউর রহমান বলেন, ‘এটা অনেক আগের সেটেল বিষয়। ডিজি স্যারের সাথে আলাপ আলোচনা করে ওই ইস্যুকে সমাধান করা হয়েছে। কারণ হাজার হাজার বস্তা যায়। লেবাররা সব বস্তা মুছে ফেলেছিল, দুই একটি বস্তা ভুলক্রমে মুছে নাই। হাজার হাজার বস্তার মধ্যে সবগুলো করা যায় না, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু লেবারদের গাফিলতির কারণে দুই একটি বস্তায় থেকে গিয়েছিল।’

বস্তার কালি মুছার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগে থেকে কোনো ফান্ড দেওয়া হয় না খাদ্য অধিদপ্তরে মোছার জন্য ফান্ডের চাহিদা দিলে দেয়। এর জন্য গুদাম কর্মকর্তা দায়ি নয়। আগে এগুলো কেনা ছিল। সরকারিভাবে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, গুদাম থেকে বের আগেই যেন স্লোগান মুছে ফেলা হয়। স্লোগান সংবলিত কোন বস্তা যেন কোনভাবেই বাহিরে না যায়।’

মতিয়ার রহমানের বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নাই। যখন যে ঘটনা ঘটে সেগুলো আমরা আর সি ফুডের কাছে পাঠাই, তখন তারা ব্যবস্থা নেয়। এটা আর সি ফুডের বিষয়। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশনায় এটা খতিয়ে দেখি। ওখানের চেয়ারম্যানের সাথে সংশ্লিষ্টজনদের কথা বলেছি, তারাও স্বীকার করেছে কিছু চাল খারাপ ছিল। তবে চাল খারাপ ছিল সেটা না। পরবর্তীতে অবশিষ্ট চাল সরেজমিনে গিয়ে কোনো রকম অভিযোগ ছাড়া ডিস্ট্রিবিউশন করে দিয়েছে। সেখানে খারাপ চাল নিয়ে অনেক আজেবাজে কথা হয়েছে। আমি বলেছি যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেখে দিতো, তাহলে সামান্য চালের জন্য ডিপার্টমেন্টের ভাবমূর্তি নষ্ট হতো না। আরও সতর্কতা অবলম্বন করলে এমনটা ঘটত না এটা বলেছি।’

খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য সচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন, ‘মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক দায়িত্ব হিসেবে তার পাওয়ার থাকতেই পারে। কেউ যদি কাজে ফাঁকি দেয় বা অনিয়ম করে তার বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নিতেই পারেন। কিন্তু মামুনুর রশিদ যদি মামলায় নাম থাকা কাউকে পদায়ন করেন, তাহলে সেই মামলার চার্জশিট ডিজির বরাবর পাঠাতে বলেন, আশা করি ব্যবস্থা নেবে।’

এছাড়া, এই বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হুমায়ুন কবির, ডিরেক্টর এডমিন মাহবুব ও অভিযুক্ত খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদের কাছে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।

স্টাফ রিপোর্টার

Recent Posts

মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, ছাত্রী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা

নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীর ধর্ষণের…

8 hours ago

চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন, অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন যাত্রীরা

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় চলন্ত যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে দ্রুত…

10 hours ago

হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: ত্রাণমন্ত্রী

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তিন মাসের…

10 hours ago

শপথ নিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।…

10 hours ago

বাধ্যতামূলক অবসরে পুলিশের ১৬ ডিআইজি

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে বাধ্যতামূলক অবসরের আওতায় বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে…

12 hours ago

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড:ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ মিলেছে

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের…

13 hours ago