তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ওমেদারদের গডফাদার বাদাম বিক্রেতা বাবু হাওলাদারের অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ

রাজধানী তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স পরিনত হয়েছে ঘুষ দুনীতির আখড়ায়। এ কমপ্লেক্সরই জমি রেজিস্ট্রেশন, দলিল সম্পাদন, নকল উঠানো, রেকর্ড তলাশি, সংশোধন এমকি জমির শ্রেণী পরিবর্তনের নামে ঘুষ গ্রহণসহ বিস্তর দুর্নীতি এবং নানাভীবে সেফ এতাশীদের যার পর নাই হয়রানির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে বাবু হাওলাদারে বিরুদ্ধে, এহেন অপকর্মে পিছিয়ে নেই দৈনিক ৬০ টাকা হাজিরার কাজ করা  রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স উমেদারদের গডফাদার বাবু হাওলাদার।

কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া এই উমেদার বাবু হাওলাদার। মূলতঃ তার নিয়েন্ত্রনে রয়েছে রেজিস্ট্রেশন অফিসের ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ ঘুষের নেটওয়ার্ক, জাল-জালিয়াতি কখনো অস্তিত্বহীন ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে কখনো বা ভূয়া কমিশনে দলিল সম্পাদনের সাধারন মানুষের জমি প্রভাবশালীদের লিখে দেওয়া, আর এসব অপকর্ম করে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা দিনে বেলা অফিসের কর্ম ঘটাতেই শুধু নয়,  রাতেওএ দপ্তরে চলে তার সিডিকেটের অপতৎপরতা।

ঢাকা তেজগাঁওয়ে অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান ‘ তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স এই কমপ্লেক্স মোট ১০টি  সাব রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে যার মধ্যে একটি হলে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিস। এই অফিসে প্রতিদিন প্রায় ৪০-৫০ টি দলিল সম্পাদিত হয়ে থাকে এবং অসুস্থ্যতাসহ অনন্যা  কারণে ঢাকাসহ দেশের যেকোনো  প্রান্তে এই  মোহাম্মদপুর সাব  রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ৫-৬টি দলিল দাতার নিজ বাসায় গিয়ে কমিশনের মাধ্যমে   জমি,  ফ্ল্যাট বা প্লাট রেজিস্ট্রেশন করে থাকে।

এসব কমিশনের ক্ষেত্রে অফিসের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সাথে নিয়ে যেতে হয়।   নিয়মঅনুযায়ী কমিশনের ক্ষেত্রে প্রতিটি কমিশনে একজন সাব রেজিস্ট্রার গিয়ে সব কিছু যাচাই-বাছাইকরে কমিশন করবেন। অথবা উক্ত সাব রেজিস্ট্রি অফিসের একজন সরকারী কর্মচারী গিয়ে কমিশন রেজিস্ট্রি করবেন। কিন্ত বাস্তবে দেখা যায় একটি  সাব রেজিস্ট্রি  অফিসে একজন সাব রেজিস্ট্রার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দলিল রেজিস্ট্রেশন, বালাম বই ,দলিলের নকল   স্বাক্ষর করতে করতে তিনি হয়তো কমিশনে যেতে পারেন না।

তাই তিনি বাধ্য হয়ে অফিসের সরকারী কর্মচারী হিসেবে অফিসের পিয়নকে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র দিয়ে তাকে কমিশন রেজিস্ট্রি করতে পাঠান।  এমনি মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসেও  কমিশন দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে অফিসের উমেদারদ বাবু হাওলাদার কে পাঠানো হয়। কমিশন দলিল রেজিস্ট্রেশন করার আগে উক্ত দলিল লেখক প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র  সাব রেজিস্ট্রারকে দেখাান।

কমিশন দাতার সমস্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সব কিছু-সঠিক  থাকলে তিনি কমিশন করার অনুমতি দেন।  তাই কমিশন দলিলে রেজিস্ট্রেশন করতে যাওয়া ব্যক্তি শুধু তাদের টিপসই  নিবেন। কিন্ত মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার বাবু হাওলাদার কমিশন রেজিস্ট্রি করতে   গিয়ে দাতা-গ্রহীতাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করে  কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে শুরু করে এবং কাগজপত্র বিভিন্ন ভুলক্রুটি ধরে তাদের কাছে থেকে মোটা অংকের টাকা  নিয়ে কমিশন  রেজিস্ট্রি  করে দেন।  তার  চাহিদামতো টাকা না পেলে দাতা-গ্রহীতাদের কমিশন রেজিস্ট্র হবে না বলে ভয়-ভীতি দেখান।

কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি এখন যদি রেজিস্ট্র না হয় তাহলে পরে তারা বিপদে পরতে পারেন এমন আশঙ্কায় তারা বাধ্য হয়ে তার চাহিদামতো টাকা দিয়ে কমিশন রেজিস্ট্র করে।  উমেদার বাবু হাওলাদারের এমন সেচ্ছাচারিতা ও অনিময়ের মাধ্যমে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা  । ঢাকায় গড়েছেন নিজস্ব বাড়ি। তার এমন সেচ্ছাচারিতার, অনিয়ম. দুর্নীতির অফিযোগ এনে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের বেশ কয়েকজন দলিল লেখক আইন উপদেষ্ঠা বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। যাতে সে কোনো কমিশন দলিল করতে যেতে না পারেন এবং তার অবৈধ আয়ের মাধ্যমে  যে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করেছে তার সঠিক তদস্ত দাবী করেন।

দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে,  একসময়ে তিনি রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স গেটেসামনে দাড়িয়ে বাদাম বিক্রিয় করতেন। পরে এক উমেদারের চা পানি দেওয়া সহ নানা ফুটফরমায়েশ খাটার কাজ নেন। নিয়োগপত্র ছাড়াই কর্তপক্ষে মৌখিক অনুমতিতে কাজ শুরু করেন বাবু হাওলাদার কিন্তু বাবু হাওলাদারের ভাগ্যর চাকা ঘুরতে সময় লাগে না বেশিদিন ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে আসলে দেশের অবস্থা কঠিন হয়ে যায়।

সে সময় সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রশাসনের ভয়ে ঘুষ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তখন ঘুস নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় উমেদারদের গডফাদার বাবু হাওলাদারকে। কেননা, বাবুর তখন নিয়োগ হয়নি। গ্রেফতার হলে কর্মকর্তারা বলতে পারেন তিনি (বাবু) তাদের কেউ না। এই সুযোগটাই কাজে লাগান বাবু। সব ঘুষের টাকা লেনদেন করতেন তিনি। সাব-রেজিস্ট্রারদের নাম দলিল ভেদে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতেন তিনি এর নাম মাত্র টাকা দিতেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বুনে যায় বাবু হাওলাদার। এর পরই রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সে উমেদারদের গডফাদার হয়ে উঠেন বাবু হাওলাদার। এই অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তার ভয়ে তটস্থ থাকেন সবই তাকে সমীহ করে চলেন। তার বিস্তারিত জানার জন্য অনুসন্ধানে গেলে নাম না প্রকাশ না করার শর্তে তার এক নিকটস্থ বাক্তির কাছ থেকে জানা যায়, তিনি সাব-রেজিস্ট্রারদের অবৈধ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় তার এক আত্মীয়র কাছে পাঠিয়ে কালো টাকা সাদা করে থাকেন।

শুধু তাই নয় ঢাকা শহরে বাড্ডায় তার মোট ৩টি বাড়ি ও বেশ কয়টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় পাঙ্গাসিয়া গ্রামে রয়েছে বিপুল সম্পত্তি। চড়েন দামি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ীতে। যা সম্পূর্নরুপে দুদক চোখের আড়ালে। নিয়োগ ছাড়া ১০ বছর উমেদার হিসেবে কাজ করলেও ২০১৭ সালে এসে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে উমেদার হিসেবে নিয়োগ নেন বাবু হাওলাদার এর পরই তার অপকর্মের মাত্রার পারদ বাড়তে থাকে দ্রুতগতিতে এই রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স তার সিন্ডিকেটের সদস্যদের ঘুষ না দিলে এই অফিসে একটি দলিলও নিবন্ধন হয় না। তার আঙ্গুর হেলনে চলেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

কিন্তু মাটি খুড়ে কেঁচু বেড় না হলেও বেড়িয়ে আসে সাপ, ২০২০ সালে ১১ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানীতে হোটেল সুইট ড্রিমের বারে প্রায় সময় মদ্যপান এবং নৃত্য দেখতেন উমেদার বাবু হাওলাদার। সেখানে শেহজাদ খান ওরফে খায়রুল হাসানের (পিতাঃ নজরুল ইসলাম, মাতাঃ আয়েশা আক্তার, গ্রামঃ মধ্য ভাগলপুর, থানা: বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ) সাথে তার পরিচয় হয়, এক সাথে তারা মদ্যপান, নৃত্য উপভোগ ও খাবার খান, হোটেলের বিল হয় ৮ হাজার টাকা। এই বিল পরিশোধ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে তারা মারামারিতে লিপ্ত হন। বিলের ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করেন বাবু। রাত সোয়া ৪ টার দিকে হোটেলের নিচে এলে তারা ফের মারামারিতে লিপ্ত হন। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন খায়রুল হাসান।

উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন। তার এ ঘটনায় তখন বনানী থানায় একটি মামলা করা হয়। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ডিবি পুলিশ বাবুকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়। আদালতে সে সময় তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে এতে বলা হয়েছিল, বাবুর মারধরে খায়ুরুলের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। এ হামলায় বাবু দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন, এতো কিছু হওয়ার পরেও তার বিরুদ্ধে আইজিয়ার অফিস ও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স কোন ব্যবস্থা নেননি তখনকার সময়।

বাবু হাওলাদার তার টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে তার এই অপকর্মের ফাইল আজও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে দেননি। মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে  উমেদার বাবু হাওলাদার কর্মরত থাকার কারনে তাকে ঘুষ না দিলে এই অফিসে কোন দলিল নিবন্ধন হয় না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এই সব দলিলের টাকা তিনি নিয়ে থাকেন দলিল লেখকদের মাধ্যমে। তার বিরুদ্ধে আইজিআর, সংসদ আইন বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও দুদকের রয়েছে ব্যাপক পরিমান অভিযোগের পাহাড়।

এসব বিষয়ে জানতে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোখলেছুর রহমানকে তার মুঠো ফোনে ফোন করলে তার ফোনটি রিসিভ হয়নি।

 

স্টাফ রিপোর্টার

Recent Posts

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জরিপ

হানিফ খোকন : নিজস্ব মতামত আমার এই জরিপ যতটা সম্ভব প্রফেশনালি এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে করা…

4 days ago

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যমুনার উদ্দেশে তারেক রহমান

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সপরিবারে যমুনার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বিএনপি…

1 month ago

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পাবে মাসিক দুই হাজার পাঁচশ টাকা প্রতিটি পরিবারঃ দুলু

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেছেন, “নারীদের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক…

1 month ago

তারেক রহমানের সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি, নেতৃত্বে সততা ও যোগ্যতার প্রতীক মাহমুদ হাসান খান বাবুর বৈঠক

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। এই…

1 month ago

আর কখনও যেন নির্বাচন ডাকাতি না হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা

বিগত ৩ নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) অনিয়মের তদন্ত রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. অধ্যাপক মুহাম্মদ…

1 month ago

কুড়িগ্রামে দুদকের অভিযানে ২১ মেট্রিক টন ধান ও ৩৫ মেট্রিক টন চাল উধাওয়ের অভিযোগ

কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্যগুদামে অভিযান চালিয়ে ধান ও চালের মজুদে বড় ধরনের গরমিল পেয়েছে দুর্নীতি দমন…

1 month ago