নরসিংদীর সাব রেজিস্ট্রার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব হোসেন সরকার ১৫ বছরের চাকরি জীবনে শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে নির্বিঘ্নে যাচ্ছেন অবসরে

মুজিবনগর সরকারের কথিত কর্মচারী হিসেবে চাকরি পাওয়া নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রার সোহরাব হোসেন সরকার গত ১৫ বছরে গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। তার বিরুদ্ধে আছে শতকোটি টাকার মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ ।

জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া ধূর্ত সোহরাব হোসেন সরকার ভূয়া শিক্ষা সনদ ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ম্যানেজ করে ২০০৯ সালে ঢুকে পড়েন সরকারি চাকরিতে। মুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে সাব-রেজিস্টার হিসেবে চাকরি করতে এসে ধরাকে সরা জ্ঞান শুরু করেন। চাকরির মেয়াদ অল্পদিন হওয়ার কারণে দুহাতে টাকা কামাতে শুরু করেন। স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়দের নামে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করেন সেসব টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৫ বছরে তিনি প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন দেশের বাইরে।

সদুল্লাপুর, শ্রীবর্দী, বরুড়া, চান্দগাও, সাভার, কুমিল্লা সদর দক্ষিন, গোবিন্দগঞ্জ, রূপগঞ্জ, মাদারীপুর সদর সহ যেখানেই পোষ্টিং পেয়েছেন সেখানেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

সাব-রেজিস্ট্রার  সোহরাব হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল আগে থেকেই। আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও সাবেক আইনমন্ত্রীর আশীর্বাদ পুষ্ট হওয়ার কারণে সেসব অভিযোগকে পাত্তা দেননি তিনি। প্রভাব খাটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় চাকরি করে গেছেন।  আওয়ামী নেতাদের দখলদারিকে আইনি বৈধতা দিতে তাকে ঢাকার সাভারে আনা হয় ২০১৮ সালে।

সাভারের ত্রাস রাজিব/সমরের অনেক খাস জমি এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের জমি রাজিব/সমর সহ তাদের অনুসারি আওয়ামী নেতাদের দখল ও বৈধকরণে ভূমিকা রাখেন সোহরাব হোসেন সরকার। পরিবর্তে সাধারণ মানুষের হয়রানি ওঠে চরমে। আর দুহাতে অবৈধ টাকা কামাতে থাকেন তিনি।

চাকরি জীবনে অসংখ্য দুর্নীতি এবং অনিয়ম করে টাকার পাহাড় গড়েছেন সোহরাব হোসেন সরকার। ভুয়া নামজারী দিয়ে দলিল করা, খাজনা আদায়ের রিসিট ছাড়া দলিল করা, গৃহায়নের সেল পারমিশন বহিভূর্ত ফ্ল্যাটের দলিল করা, দলিলে ফিস দাগানোর ফলে অবৈধ কাজের দ্বারা অর্জিত বিপুল অর্থ যা দ্বারা তিনি নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এমনকি সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন সাব-রেজিস্টার সোহরাব হোসেন সরকার।

সোহরাব হোসেন সরকারের আওয়ামী যোগাযোগ এতোই শক্তিশালী ছিল যে, চাকরিবিধি অমান্য করে যখন যে অফিসে মন চেয়েছে সেই অফিসে বদলী হয়ে এসেছেন । ঢাকার সাভারে যোগদানের পর থেকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষকে নানান বিড়ম্বনায় ফেলে, আইনি ভীতি প্রদর্শন করে অবৈধ অর্থ উপার্জন করতে শুরু করেন।

সদুল্লাপুর, শ্রীবর্দী, বরুড়া, চান্দগাও, সাভার, কুমিল্লা সদর দক্ষিন, গোবিন্দগঞ্জ, রূপগঞ্জ, মাদারীপুর সদর সহ যেখানেই পোষ্টিং পেয়েছেন সেখানেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন সোহরাব হোসেন সরকার। দালাল এবং নকল নবিসদের নিয়ে তৈরি এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিমাসে হাতিয়ে নেন বিপুল পরিমান টাকা।

সাভারের এক বাসিন্দা অভিযোগকারী সোহরাব হোসেন সরকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘সাব-রেজিস্টার সোহরাব হোসেন সরকারের নাম নিলেও পয়সা খরচ করতে হয়। তার চারপাশ ঘিরে থাকে দালালদের সিন্ডিকেট। কয়েক দফা তাদের হেনস্তার শিকার হয়েছি আমি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোহরাব হোসেন সরকার ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত যত জায়গায় চাকরি করেছেন, প্রত্যেক জায়গাতেই ছিল তার সিন্ডিকেট গড়ে তোলার প্রবনতা।

তার দায়িত্বকালে জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় রাজস্ব হিসেবে জমাকৃত পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট ও চেক ব্যাংকের হিসেবে নির্ধারিত সময়ে জমা হয় না। এ কারণে এসব পে-অর্ডার ও চেক সংশ্লিষ্ট দফতর হতে খোয়া গেছে একাধিকবার। জালিয়াতির মাধ্যমে এ সব অর্থ আত্মসাত করেছেন তিনি। জমি রেজিস্ট্রিকালে জমাকৃত জাল পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট কিংবা চেক নির্ধারিত সময়ে জমা না দেয়ার কারণে ধরা পড়েনি।

এসব চেক ও পে-অর্ডার এন্ট্রি দেয়ার জন্য রক্ষিত রেজিস্ট্রারের সকল কলামগুলো পূরণ করা হয়নি। রেজিস্ট্রেশন ম্যানুয়েল অনুযায়ী ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্ট বা সিটিআর নিয়মিত ব্যাংকের সাথে মিলিয়ে সংরক্ষণ করার বিধান থাকলেও বাস্তবে তা সংরক্ষণ করা হয়নি। পে-অর্ডার কিংবা চেক সময়মতো রাজস্ব খাতে জমা না হলে তা সংশ্লিষ্ট ইস্যুকারী ব্যাংকে দাবিদারবিহীনভাবে পড়ে থাকে। এক সময় তা ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা আত্মসাতের সুযোগ পায়। এভাবে এই খাত থেকেও টাকার ভাগ নিয়েছেন সোহরাব হোসেন সরকার।

এ ছাড়া বিতর্কিত জমিগুলো রেজিস্ট্রেশন করে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার একাধিক প্রমাণ এসেছে তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। আইনের অপব্যাখ্যা দিয়ে মোটা অংকের টাকা নিয়ে সরকারি খাস জমি নিবন্ধন, জমির শ্রেণি পরিবর্তনসহ খাজনা খারিজ ব্যাতিত ভূমি নিবন্ধন করেছেন অহরহ। ফলে সরকার মোটা অংকের রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে।

সরেজিমনে অনুসন্ধনে জানা যায়, দুর্নীতিবাজ এ সাব-রেজিস্ট্রার ২০০৯ সালে মুজিবনগর সরকারের ভূয়া সনদ দাখিল করে সাব-রেজিস্ট্রার পদে গত ১৯/১২/২০০৯ইং তারিখে গাইবান্ধার সদুল্লাপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। সেখানে যোগদান করেই নানা অপকর্ম করে দুহাতে কামিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা।

তারপর বদলী হন শ্রীবর্দী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। সেখানে খাস জমি ব্যক্তিমালিকানায় দলিল রেজিস্ট্রি করে হয়ে জান টাকার কুমির। এরপর পরযায়ক্রমে শিল্প এলাকা রূপগঞ্জে বদলি হয়ে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানীর নামে দলিল রেজিস্ট্রি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে চলে যান তিনি।

বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সেসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বদলী হন দেশের লোভনীয় সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। বরুড়া, চান্দগাও, সাভার, কুমিল্লা সদর দক্ষিন ও গোবিন্দগঞ্জে চাকরির সময়ে দলিল মূল্যের ১% অগ্রিম গ্রহণ ব্যতিত দলিল করতেন না তিনি। সেরেস্তা ফি’র নামেও আদায় করেন দলিল প্রতি ২ হাজার টাকা। হেবার ঘোষনা দলিলে প্রতি শতাংশে ৩শ টাকা, বিনিময় দলিলে প্রতি শতাংশে ৫শ টাকা, হাইভেল্যুর নামে আদায় করেন ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। নকল প্রতি সাব-রেজিস্ট্রার সোহরাব হোসেন সরকার নিতেন ১৫শ টাকা।

এমনও হয়েছে, জেলা রেজিস্ট্রারের অনুমতি ব্যতিত বহু দলিল কমিশনে রেজিস্ট্রি করে থাকেন তিনি। আওয়ামী প্রভাব খাটিয়ে এসব করতে তিনি। ডিআর এর নামেও বিভিন্ন খাত থেকে আদায় করে থাকেন প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে গত ১৫ বছরে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন সাব-রেজিস্টার লুসোহরাব হোসেন সরকার। যার বড় একটা অংশ পাচার করেছেন দেশের বাইরে।
স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের দোসর এই সাব-রেজিস্টার সোহরাব হোসেন সরকার এখনো তার অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বৈরাচার আওয়ামী মুক্ত এই সরকারের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার কাছে দেশ বাসির দাবি এই দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পাসপোর্ট বাতিল করে তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হোক।

সাব-রেজিস্ট্রার সোহরাব হোসেন সরকারের দুর্নীতি অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক বলেন, ‘অভিযুক্ত সকল সাব-রেজিস্ট্রারের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। আমাদের একটু সময় দিন। তার অবসরের আগেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

স্টাফ রিপোর্টার

Recent Posts

মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, ছাত্রী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা

নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীর ধর্ষণের…

2 hours ago

চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন, অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন যাত্রীরা

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় চলন্ত যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে দ্রুত…

4 hours ago

হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: ত্রাণমন্ত্রী

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তিন মাসের…

4 hours ago

শপথ নিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।…

4 hours ago

বাধ্যতামূলক অবসরে পুলিশের ১৬ ডিআইজি

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে বাধ্যতামূলক অবসরের আওতায় বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে…

7 hours ago

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড:ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ মিলেছে

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের…

7 hours ago