মিঠাপুকুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মঃখাদ্য কর্মকর্তা মাহবুবের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝড়
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্ষমতাসীন মহলের ‘মন জয়ের’ জন্য মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সুপরিকল্পিতভাবে আবেদনকারীদের কাগজপত্র গুম, সঠিক তথ্য থাকার পরও আবেদন বাতিল, এবং পক্ষপাতদুষ্ট যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। জানা গেছে, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে মোট ৫৪টি ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই প্রক্রিয়াতেই একাধিক আবেদনকারী অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।
উপজেলার ২নং রাণীপুকুর ইউনিয়নের আবেদনকারী শাহ আলম বলেন, আমি ট্রেড লাইসেন্স জমা দিয়েই ফুড গ্রেইন লাইসেন্স সংগ্রহ করেছি। এটি সরকারি প্রক্রিয়ার একটি বাধ্যতামূলক অংশ, যা ছাড়া ফুড গ্রেইন লাইসেন্স ইস্যু হওয়ার সুযোগ নেই। অথচ এখন খাদ্য অফিস দাবি করছে যে, আমি ট্রেড লাইসেন্স জমা দেইনি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে অঙ্গীকারনামা খাদ্য অফিস নিজেরাই আমাদের দিয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে সাতটি সংযুক্তির তালিকা ছিল, সেই তালিকায় কোথাও ট্রেড লাইসেন্স জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ নেই। আমরা সেই অঙ্গীকারনামা অনুযায়ী কাগজপত্র জমা দিয়েছি। অথচ এখন তারা সেই তালিকাবদ্ধ শর্তই মানছে না। বরং অতিরিক্ত কাগজ চেয়ে, বা আমাদের দেওয়া কাগজ অস্বীকার করে প্রক্রিয়াকে জটিল ও বিভ্রান্তিকর করে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, এই অঙ্গীকারনামা আমাদের দেওয়া হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, যাতে আমরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আবেদন করি। অথচ এখন মনে হচ্ছে, আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্যই ওই অঙ্গীকারনামা দিয়েছিল, যাতে পরবর্তীতে ইচ্ছামতো কাউকে বাদ দেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, তারা নিজে যে শর্ত তৈরি করেছে, সেই শর্ত নিজেরাই কেন মানছে না? এতে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নেই এবং এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা খাদ্য কর্মকর্তাদের কাছে এর সুষ্ঠু জবাব চাই এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানাই।
উপজেলার ৭ নং লতিবপুর ইউনিয়নের আবেদনকারী মোহাম্মদ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আমি সব প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিয়েছি। এরপরও আমার নাম তালিকায় নেই। যদি ভুল হতো তাহলে অন্তত বাতিলের তালিকায় নাম থাকার কথা। কিন্তু খাদ্য অফিস আমার কাগজ গায়েব করেছে। এমনকি অফিস থেকেই আমাকে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ডাকা হয়েছিল।
উপজেলার ৭ নং লতিবপুর ইউনিয়নের আবেদনকারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আমার আবেদন বাতিল করা হয়েছে ট্রেড লাইসেন্স না থাকার অজুহাতে। অথচ ফুডগ্রেইন লাইসেন্সের জন্য ট্রেড লাইসেন্স ছিল বাধ্যতামূলক, যা আমি জমা দিয়েছি। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কাগজ সরিয়ে আমাকে বাতিল করেছে। আমি এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জও করেছি।
উপজেলার ২ নং রাণীপুকুর ইউনিয়নের আবেদনকারী আব্দুর রহিম বলেন, খাদ্য অফিসের দেওয়া তালিকায় ট্রেড লাইসেন্সের কথা ছিল না, তাই জমা দেইনি। অথচ এখন তারা ট্রেড লাইসেন্স না থাকার অজুহাতে আমার আবেদন বাতিল করেছে।
উপজেলার ৭ নং লতিবপুর ইউনিয়নের আবেদনকারী রাকিবুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, আমার আবেদন যাচাই-বাছাই করেই বাতিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদেরই টিকিয়ে রেখে বাকি সবাইকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
উপজেলার ২ নং রাণীপুকুর ইউনিয়নের আবেদনকারী রুহুল আমিন বলেন, আমার আবেদন বাতিল করা হয়েছে ট্রেড লাইসেন্স না থাকার অভিযোগে। অথচ ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ফুডগ্রেইন লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগই নেই। আমি কাগজ দিয়েছি, প্রমাণসহ। তাহলে কেন বাতিল?
মিঠাপুকুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগের ৪৫৫টি আবেদন জমা পড়েছে। বিগত ইউএনও বিকাশ চন্দ্র স্যারের সভাপতিত্বে ১০ সদস্য বিশিষ্ট দুটি কমিটি গঠন করা হয়। এই ১০ জন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বক্স সিলগালা করা, খোলা এবং যাচাই-বাছাইসহ পুরো কার্যক্রম ইউএনও স্যারের কক্ষে সিসি ক্যামেরার আওতায় সম্পন্ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে দেখা যায় ৩১৩টি আবেদন ফিট এবং ১৪২টি আবেদন আনফিট তালিকায় এসেছে। যারা বলছে তারা কাগজপত্র জমা দিয়েছে কিংবা সরবরাহ করেছে, তাদের আমরা কমিটির মাধ্যমে পুনরায় ডেকে পাঠিয়েছি। বর্তমানে সেই আবেদনগুলোর পুনরায় যাচাই-বাছাই চলছে। তবে তারা সত্যিই কাগজপত্র জমা দিয়েছে কি না, তা এই মুহূর্তে আমার জানা নেই।
পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার তদারকি ও স্বচ্ছতার বিষয়ে জানতে চাইলে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, মিটিংয়ে আছি এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।