চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ থানাধীন বালুচরা এলাকায় অবস্থিত বিআরটিএ (মেট্রো-২ সার্কেল) কার্যালয়টি এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির এক মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অফিসের ভেতরে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী আর বাইরে দাপুটে দালালচক্রের যোগসাজশে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্য কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে উপ-পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. সানাউল হকের নাম, যিনি এর আগে সিলেটে থাকাকালীনও একই ধরনের অপকর্মের দায়ে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে বিতাড়িত হয়েছিলেন।
টাকা দিলেই মেলে লাইসেন্স, নেই পরীক্ষার বালাই
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করলেও চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে দক্ষ চালক হওয়ার চেয়ে ‘ঘুষ’ দেওয়াটাই লাইসেন্স পাওয়ার প্রধান শর্ত। এই সিন্ডিকেটকে অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ১০ হাজার এবং পেশাদারদের জন্য ১২ হাজার টাকা দিলেই কোনো ধরনের লিখিত বা ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স হাতে পাওয়া যাচ্ছে। অথচ বৈধ পথে আবেদন করে যোগ্য প্রার্থীরা বছরের পর বছর ঘুরলেও লাইসেন্স পাচ্ছেন না। এতে সড়কে অদক্ষ চালকের সংখ্যা বাড়ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সিন্ডিকেটের মূলে যারা
এই বিশাল ঘুষ বাণিজ্যের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একটি নির্দিষ্ট চক্র। যাদের মধ্যে রয়েছেন— সিল কন্ডাক্টর মহসিন, জেলা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সলিম উল্যাহ, অফিস পিয়ন খোরশেদ আলম, জুয়েল, সোহেল, পঙ্কজ, সেলিম, মহিউদ্দিন এবং নৈশপ্রহরী লিটন। ভুক্তভোগীদের দাবি, কর্মকর্তাদের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় নৈশপ্রহরী লিটনের দাপট সবচেয়ে বেশি, যিনি সরাসরি দালালদের সমন্বয় করেন।
সিলেটের সেই বিতর্কিত ইতিহাস
মো. সানাউল হকের দুর্নীতির রেকর্ড নতুন নয়। ২০২২ সালে তিনি যখন বিআরটিএ সিলেট কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন, তখন তার লালিত দালাল সিন্ডিকেটের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ‘সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। ব্যাপক জনদুর্ভোগ এবং দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় তৎকালীন সময়ে তাকে সেখান থেকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামে আসার পর তিনি আরও সুসংগঠিতভাবে তার পুরোনো অপকৌশল প্রয়োগ করছেন।
সেবাভেদে ঘুষের ‘রেট চার্ট’
ভুক্তভোগী চালক ও মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিটি কাজের জন্য এখানে অলিখিতভাবে টাকা নির্ধারিত রয়েছে:
-
বাসের রুট পারমিট ও ফিটনেস: ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা।
-
হিউম্যান হলার: ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা।
-
ট্রাক/ড্রাম ট্রাক: ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।
-
অটোরিকশা: ৪০০ টাকা।
-
ড্রাইভিং লাইসেন্স: নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা।
-
অন্যান্য: গাড়ি না দেখেই ফিটনেস এবং মোটরসাইকেল পরিদর্শন ছাড়াই রেজিস্ট্রেশনও সম্পন্ন হচ্ছে এই টাকার বিনিময়ে।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
রাহাত্তারপুল এলাকার লেগুনা চালক রশিদুল ও পতেঙ্গার সিএনজি চালক সোহাগ মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও কাজ হয় না। অথচ দালাল ধরলে বা টেবিলে টাকা দিলে মুহূর্তেই সব ফাইল ক্লিয়ার হয়ে যায়।”
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিআরটিএকে দুর্নীতির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দুই-একজন দালাল আটক হলেও মূল হোতারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম মেট্রো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক সানাউল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এই দুর্নীতির আখড়া থেকে মুক্তি পেতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও শুদ্ধি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন।