ফুটবল বিশ্বে লিওনেল মেসির নাম এখন কেবল একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং একটি বিশাল ব্র্যান্ড এবং অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইন্টার মায়ামির সহ-মালিক হোর্হে মাস সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে মেসির পারিশ্রমিক নিয়ে যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তাতে ফুটবল দুনিয়ায় নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, ক্লাব থেকে বেতন এবং দলের মালিকানার অংশীদারিত্ব মিলিয়ে মেসি বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করছেন।
ব্লুমবার্গ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রমতে, হোর্হে মাস স্পষ্ট করেছেন যে মেসির এই বিশাল অংকের পারিশ্রমিক মূলত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। এমএলএস প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মেসির মূল বেতন ১২ মিলিয়ন ডলার।
তবে বোনাস এবং চুক্তির অন্যান্য শর্ত মিলিয়ে তার নিশ্চিত বার্ষিক আয় ধরা হয় ২০.৪৫ মিলিয়ন ডলার। মেসির চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ইন্টার মায়ামি ক্লাবের মালিকানার একটি নির্দিষ্ট শতাংশ।
হোর্হে মাসের দেওয়া তথ্যমতে, ক্লাবের এই শেয়ারের মূল্য বছরে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ, মেসি খেলোয়াড় হিসেবে যে বেতন পান, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আয় করছেন ক্লাবের অংশীদার হিসেবে।
মেসি আসার আগে ইন্টার মায়ামির আর্থিক অবস্থা আর বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। ২০২৩ সালে মেসি সই করার আগে ক্লাবের বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৫৮৫ মিলিয়ন ডলার। ফোর্বসের সর্বশেষ রেটিং অনুযায়ী, মেসির জাদুকরী উপস্থিতির কারণে ইন্টার মায়ামির বর্তমান মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার।
হোর্হে মাস আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন, আমি মেসিকে যা দিচ্ছি, তা তার যোগ্যতার প্রতি প্রতিটি পয়সার সঠিক মূল্যায়ন। বিশ্বমানের খেলোয়াড় ধরে রাখতে গেলে বিশ্বমানের স্পন্সর প্রয়োজন, কারণ এই খেলোয়াড়রা অনেক দামী।
লিওনেল মেসি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়। এই তালিকায় তার পেছনে যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে এলএএফসি এর সন হিউং মিন ১১.১৫ মিলিয়ন ডলার এবং সার্জিও বুসকেটস ৮.৭৫ মিলিয়ন ডলার আয় করছেন, যিনি গত মৌসুম শেষে অবসর নিয়েছেন। মেসি ইন্টার মায়ামির সাথে তার চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছেন, যা ২০২৮-২৯ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মেসির এই মালিকানা স্বত্ব বা ইক্যুইটি অংশটি তিনি অবসর নেওয়ার পর সক্রিয় হবে। এর ফলে ফুটবল ছাড়ার পরও ইন্টার মায়ামির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মেসির বড় ভূমিকা থাকবে। ডেভিড বেকহ্যাম, হোর্হে মাস এবং হোসে মাসের সাথে মেসিও এখন ইন্টার মায়ামির অন্যতম প্রধান মুখ।
ইন্টার মায়ামির এই ৮০ মিলিয়ন ডলার আয়ের বাইরেও মেসির আরও বেশ কিছু লাভজনক চুক্তি রয়েছে। এমএলএস এ যোগ দেওয়ার সময় তিনি অ্যাপল এবং ফ্যানাটিকস এর সাথে আলাদা ব্যবসায়িক চুক্তি করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে এবং লিগের অংশীদার হিসেবে অ্যাডিডাসের সাথেও তার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি রয়েছে।
তবে হোর্হে মাস যে ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলারের কথা বলেছেন, তার মধ্যে এই বাইরের স্পন্সরশিপের অর্থ অন্তর্ভুক্ত নেই। অর্থাৎ মেসির প্রকৃত বার্ষিক আয় ১০০ মিলিয়ন ডলার অনায়াসেই ছাড়িয়ে যায়।
ফুটবল মাঠের বাইরেও মেসির প্রভাব এখন ব্যাপক। সম্প্রতি ইন্টার মায়ামি এবং মেসির কর্মকাণ্ড মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয়েও কিছুটা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে মেসি খুব কমই রাজনীতিতে জড়ান, কিন্তু ইন্টার মায়ামির বৈশ্বিক অবস্থান তাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী মহলে এক বিশেষ মর্যাদায় বসিয়েছে।
লিওনেল মেসি কেবল মায়ামির জার্সি গায়ে গোল করছেন না,
তিনি পুরো আমেরিকান সকার ইন্ডাস্ট্রির মানচিত্র বদলে দিচ্ছেন। ৮০ মিলিয়ন ডলারের এই বিশাল বিনিয়োগ ইন্টার মায়ামির জন্য লোকসান নয়, বরং এক বিশাল লাভজনক বাজি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। মাঠের খেলায় জাদুকরী পারফরম্যান্স আর মাঠের বাইরে ক্লাবের ব্যবসায়িক উচ্চতা, সব মিলিয়ে মেসি এখন মায়ামির অবিসংবাদিত সম্রাট।