রক্তস্নাত মধ্যপ্রাচ্য ও ওয়াশিংটনের ‘নৈরাজ্যবাদী’ রণকৌশল: যেভাবে ধ্বংসের মুখে একের পর এক রাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র আজ রক্তে রঞ্জিত। গত শনিবার ইরান ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুরসহ শীর্ষ নেতৃত্বের বিদায় এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক ‘ভূমিকম্পসম’ পরিবর্তন এনেছে।

কিন্তু এই আকস্মিক সংঘাত কি কেবলই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? রাশিয়ার প্রখ্যাত গবেষক নিকোলাই সুকহভ এবং আরটি (RT)-এর বিশ্লেষণ বলছে, এটি গত সাত দশকের সেই চিরচেনা মার্কিন কৌশলেরই একটি আধুনিক সংস্করণ যেখানে উন্নয়ন নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’র মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।

নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো কীভাবে দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে। তৎকালীন ইরানের জনপ্রিয় ও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যখন দেশের তেল সম্পদকে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেন, তখন থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের রোষানলে পড়েন তিনি।

১৯৫৩ সালে মার্কিন সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স মিলে ইরানে এক ভয়াবহ অভ্যুত্থান ঘটায়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত মোসাদ্দেককে হটিয়ে স্বৈরশাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

সিআইএ কেবল ক্ষমতা বদল করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা শাহর কুখ্যাত গুপ্তচর বাহিনী ‘সাবাক’ (SAVAK) গঠনে সরাসরি প্রশিক্ষণ দেয়। এই বাহিনী ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর যে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল, তা আজও ইরানের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। ১৯৫৩-এর সেই ক্ষত থেকেই ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের জন্ম, যা আজও ওয়াশিংটন-তেহরান শত্রুতার মূল ভিত্তি।

১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন, তখন ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল মিলে মিসর আক্রমণ করে। যদিও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এই আক্রমণকে সমর্থন করেননি, তবে তার পেছনে কোনো মানবিক কারণ ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে হটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরঙ্কুশ অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। আইজেনহাওয়ার জানতেন, সরাসরি ঔপনিবেশিক কায়দায় হামলা চালালে এই অঞ্চলের দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়বে। ফলে তিনি জাতিসংঘকে ব্যবহার করে মিত্রদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই মধ্যপ্রাচ্যের ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ নিয়ন্ত্রকের আসনে বসেন।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ ছিল মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অপরাধ। নাইন-ইলেভেনের পর ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে সাদ্দাম হোসেনের কাছে কাল্পনিক ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ (WMD) থাকার ধুয়া তুলে দেশটিকে তছনছ করে দেওয়া হয়।

ইরাকের সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেওয়ার ফলে এক ভয়াবহ নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যতার সুযোগেই আল-কায়েদা এবং পরবর্তীকালে আইএসের (ISIS) মতো গোষ্ঠীগুলো ইরাকে শেকড় ছড়ায়।

অধ্যাপক সুকহভের মতে, ইরাকের অস্থিতিশীলতা আসলে ওয়াশিংটনকে দীর্ঘমেয়াদে সেখানে থাকার এবং তেলের বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার এক ‘কৌশলগত অজুহাত’ তৈরি করে দিয়েছিল।

মুয়াম্মার গাদ্দাফির অধীনে লিবিয়া ছিল আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু ২০১১ সালে তথাকথিত ‘আরব বসন্ত’-এর সুযোগ নিয়ে ন্যাটো জোটের মাধ্যমে গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

আজ লিবিয়া এক খণ্ডিত রাষ্ট্র, যেখানে আইনের শাসন নেই। কিন্তু মজার বিষয় হলো, গত কয়েক বছরে লিবিয়ার অস্থিতিশীলতার সুযোগে সেখানে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই মার্কিন কোম্পানি ‘শেভরন’ লিবিয়ার বিশাল তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র উন্নয়নের লাইসেন্স পেয়েছে। অর্থাৎ, একটি দেশ ধ্বংস হলেও মার্কিন করপোরেট স্বার্থ সেখানে ঠিকই সংরক্ষিত হয়েছে।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ মার্কিন হস্তক্ষেপের এক নতুন রূপ দেখিয়েছে। সরাসরি যুদ্ধের বদলে সিআইএ-র গোপন প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। এর ফলে গৃহযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর আহমেদ আল-শারার অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলেও সিরিয়ার ভবিষ্যৎ এখনো অন্ধকার। এক সময়ের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত আল-শারা এখন ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে মরিয়া। এটি প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থের প্রয়োজনে যেকোনো পক্ষের সাথে হাত মেলাতে দ্বিধা করে না।

বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সরকার পরিবর্তন করে তেলক্ষেত্র দখল করত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর এই ‘পুরানো ধাঁচ’ পাল্টে এখন তারা নিজেকে ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।

নিকোলাই সুকহভের মতে, ওয়াশিংটন এখন কেবল তেলের খনি চায় না, তারা চায় তেলের পরিবহণ পথ, বাজার এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের হাতে থাকুক। ভেনিজুয়েলা থেকে ইরান সবখানেই তারা এই ‘এনার্জি ডিপ্লোম্যাসি’ বা জ্বালানি কূটনীতি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

বর্তমান সংকট অর্থাৎ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এই দীর্ঘ সংঘাতের এক চূড়ান্ত বিন্দু। ইরানের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার শেষ কোথায় কেউ জানে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ অভিযান কেবল একটি সামরিক বিজয় নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে পুনরায় নিজেদের ছাঁচে ঢেলে সাজানোর (Restructuring) এক বিপজ্জনক প্রচেষ্টা। যখন একটি দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, তখন সেই নিরাপত্তাহীনতার সুযোগ নিয়ে বাইরের শক্তিগুলো সহজেই হস্তক্ষেপ করতে পারে।

উপরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি কখনোই এই অঞ্চলের জনগণের উন্নয়ন বা গণতন্ত্রের জন্য ছিল না। তাদের নীতি ছিল চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে:

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের জন্য শান্তি এখনো এক দূরবর্তী মরীচিকা। ওয়াশিংটনের এই ‘ধ্বংসাত্মক কূটনীতি’ যত দিন কার্যকর থাকবে, তত দিন এই অঞ্চলের প্রতিটি রাষ্ট্রকেই এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হবে।

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক

Recent Posts

দুর্নীতির মামলায় সাবেক আইজিপি বেনজীরের বিচার শুরু

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: ১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি)…

24 minutes ago

নিখোঁজের তিন দিন পর ধান ক্ষেতে মিললো শিশুর লাশ, হত্যার অভিযোগ পরিবারের

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় নিখোঁজের তিন দিন পর ফাতেমা আক্তার পলি নামে এক শিশুর মরদেহ…

35 minutes ago

আলমডাঙ্গায় ডিএনসি’র ঝটিকা অভিযান: লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বের হলো ৪৫ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় মাদক লুকানোর এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেও শেষ রক্ষা হয়নি মো.…

4 hours ago

সিলেটে শ্রমিক তোপে বিতাড়িত সেই ডিডি সানাউল: চট্টগ্রামে গড়েছেন দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্য ‘রাজত্ব’

বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ থানাধীন বালুচরা এলাকায় অবস্থিত বিআরটিএ (মেট্রো-২ সার্কেল) কার্যালয়টি এখন…

5 hours ago

ঝিনাইদহে বাসে র‍্যাবের বড় অভিযান: পরিত্যক্ত ব্যাগ থেকে মিলল সাড়ে ৭ কোটি টাকার ‘আইস’

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহ জেলা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে প্রায়…

17 hours ago

৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের শঙ্কা, সঙ্গে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: রাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিভারী বর্ষণের পাশাপাশি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়…

18 hours ago