ঢাকার রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দলিলের দালাল থেকে দুবাই স্টাইলে বিলাসিতা করা ওরা ১১জন কোটিপতি ওমেদার

পর্ব–১

রাজধানী তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের কোটিপতি ওমেদার ঝাড়ুদার রয়েছে অনেকেই। শূন্য থেকে শতকোটি টাকার মালিক রয়েছেন ৬০ টাকা দিন হাজিরার ওমেদার ও ঝাড়ুদারদের মধ্যে। ঢাকা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স জুড়ে দুর্দান্ত দাপটে চলছে এক ভয়াবহ সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মধ্যে ওমেদার, ঝাড়ুদার, পিয়ন, মোহরার, এক্সটা মোহরার, রেকর্ড কিপার সহ শতাধিক ব্যক্তির নাম থাকলেও সারাবছর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ওরা ১১ জন। 

বর্তমানে এই ১১ জনের মধ্যে বহুল আলোচিত নাম মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের ওমেদার বাবু হাওলাদার,আব্দুস সোবহান, আওলাদ হোসেন, আওলাদের ভাই আকিব হোসেন,সাব রেজিস্ট্রার সহকারী হারিচ, গুলশান সাব রেজিস্ট্রার অফিসের পিন্টু, মঞ্জু, পল্লব ভর  জসিম, রাজিব, ধানমন্ডির রানা,খিলগাঁওয়ের রাসেল, মেহেদি, উত্তরা সাব রেজিস্ট্রার অফিসের ঝাড়ুদার থেকে শতকোটি টাকার মালিক মঞ্জু, মানিক এইরকম ৫ডজন ওমেদার, মোহরার, অফিস সহায়ক, নাইটগার্ড, ঝাড়ুদার সাব রেজিস্ট্রার সহকারীদের হাতে গোটা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স এখনো জিম্মি।

সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম, সাবেকুন নাহার,আইজিআর শহিদুল ইসলাম ঝিনুক মহোদয়কে এরা যেমন কারাবন্দি আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নাম ভাঙিয়ে কোনঠাসা করে রাখতো। বর্তমানেও ঢাকা রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সে এরা জেলা রেজিস্ট্রার (DR) মুন্সি মোখলেছুর রহমানকেও তারা থোড়াই কেয়ার করেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

ওমেদারদের গডফাদার মদ্যপ হাজী ও মার্ডার মামলার স্বীকারোক্তি দেওয়া আসামী বাবু হাওলাদার। একসময়ের ফুটপাতে ও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সামনে বাদাম বিক্রয়ের হকার থেকে বাবু হাওলাদার এখন শতকোটি টাকার মালিক। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় ৫ টি বিলাসবহুল বাড়ী ও ৮টি ডুপ্লেক্স ফ্লাট,কোটি টাকার ৩টি গাড়ী ও নামে বেনামে দেশে বিদেশে একাধিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক ৬০ টাকা দিন হাজিরার কর্মচারী ওমেদার বাবু হাওলাদার। শুধু রাজধানীতেই নয় তার জন্মস্থান পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলার পাঙ্গাসিয়া গ্রামে রয়েছে বাবু হাওলাদারের অঢেল সম্পত্তি।।

বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ঘুষ দুর্নীতির অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স ঢাকা পরিণত হয়েছে ঘুষ দুর্নীতি, জাল দলিল সম্পাদন, ভলিউম লোপাট, টেম্পারিং, ভলিউমের পাতা চুরি, খাস খতিয়ান ও শত্রু সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় ও ডেভলপার কোম্পানির নামে রেজিষ্ট্রেশন করার এক নিরাপদ তীর্থস্থান হিসেবে।। এ কমপ্লেক্সরই জমি রেজিস্ট্রেশন, দলিল সম্পাদন, নকল উঠানো, রেকর্ড তল্লাশি, সংশোধন এমনকি জমির শ্রেণী পরিবর্তনের নামে ঘুষ গ্রহণসহ বিস্তর দুর্নীতি এবং ব্লাকমেইলিংয়ের কারণে সেবা প্রত্যাশীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে টানা তিন যুগ ধরে। এরমধ্যে ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় থেকে ঘুষ দুর্নীতির পারদ চড়তে থাকে দফায় দফায়। যা জুলাই বিপ্লবের পরবর্তি সময়েও কোন পরিবর্তন হয়নি বরং ঘুষের রেট প্রতিদিন বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া এই উমেদার বাবু হাওলাদার। মূলতঃ বাবু হাওলাদার, সোবহান, আওলাদ, আকিব, হারিচ ঘুরেফিরে এরাই শোষণ করছে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসকে টানা দেড় যুগ ধরে। এদের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিস রেজিস্ট্রেশন অফিসের ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ ঘুষের নেটওয়ার্ক, জাল-জালিয়াতি সিন্ডিকেট। এরা কখনো অস্তিত্বহীন ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে কখনো বা ভূয়া কমিশনে দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমি প্রভাবশালীদের লিখে দেওয়া, আর এসব অপকর্ম করে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। দিনের বেলা শুধু অফিসের কর্ম ঘণ্টাতেই শুধু নয়, রাতের আঁধারেও এ দপ্তরে চলে তাদের ভয়াবহ সিডিকেটের বেআইনী অপতৎপরতা ।

জানা গেছে একসময়ে বাবু হাওলাদার রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাদাম বিক্রিয় করতেন। পরে এক উমেদারের চা পানি দেওয়া সহ নানা ফুটফরমায়েশ খাটার কাজ নেন। নিয়োগপত্র ছাড়াই কর্তপক্ষের মৌখিক অনুমতিতে কাজ শুরু করেন বাবু হাওলাদার। তবে বাবু হাওলাদারের ভাগ্যর চাকা ঘুরতে সময় লাগে না বেশিদিন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফখরুদ্দিন ক্ষমতাসীন হয়ে আসলে দেশের অবস্থা কঠিন হয়ে যায়। শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া সহ বাঘা বাঘা নেতা আমলা মন্ত্রীদের জেলে পাঠায় ওয়ান ইলেভেন সরকার।

সে সময় দুর্নীতিগ্রস্ত অন্যান্য সরকারি অফিসের ন্যায় সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রশাসনের ভয়ে ঘুষ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তখন ঘুষ নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় উমেদার বাবু হাওলাদারকে। কেননা, বাবুর তখন নিয়োগ হয়নি। গ্রেফতার হলে কর্মকর্তারা বলতে পারবেন তিনি (বাবু) তাদের কেউ না। এই সুযোগটাই কাজে লাগান বাবু। সব ঘুষের টাকা লেনদেন করতেন বাবু নিজেই। সাব-রেজিস্ট্রারদের নামে দলিল ভেদে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতেন তিনি। এর মধ্যে নামমাত্র টাকা দিতেন সাব রেজিস্ট্রার ও অন্যান্য কর্মচারীদের। বাকি টাকা পুরোটাই আত্মসাৎ করতে থাকেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে আঙ্গুল ফুলে তালগাছ বনে যায় বাবু হাওলাদার। এর পরই রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সে ক্রমশঃ উমেদারদের গডফাদার হয়ে উঠেন বাবু হাওলাদার। এই অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী তার ভয়ে তটস্থ থাকেন। সবাই তাকে সমীহ করে চলতে থাকেন।
তার বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য অনুসন্ধানে গেলে নাম না বলার শর্তে বাবুর এক নিকটস্থ আত্মীয়র কাছ থেকে জানা যায়, তিনি সাব-রেজিস্ট্রারদের অবৈধ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় তার এক আত্মীয়র কাছে পাঠিয়ে কালো টাকা সাদা করে থাকেন। এ খবর গোপনে প্রচার হতে থাকলে তিনি বর্তমান সময়ের দুজন জেলা রেজিস্ট্রার এর সমুদয় কালো টাকা বাবু হাওলাদার হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে কোটিকোটি টাকা লুটে নেন। সেই থেকে আর কখনো পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বাবু হাওলাদারকে।

বাবু হাওলাদারের অবৈধ সম্পদ ও কর্মজীবন:

ঢাকা শহরে বাড্ডায় তার মোট ৩টি বাড়ি ও বেশ কয়টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় পাঙ্গাসিয়া গ্রামে রয়েছে বিপুল সম্পত্তি। চড়েন দামি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ীতে। যা সম্পূর্ণরূপে দুদকের চোখের আড়ালে। শুরুর দিকে নিয়োগ ছাড়া ১০ বছর উমেদার হিসেবে কাজ করলেও ২০১৭ সালে এসে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে উমেদার হিসেবে নিয়োগ নেন বাবু হাওলাদার।
এর পরই তার অপকর্মের মাত্রার পারদ বাড়তে থাকে দ্রুতগতিতে। এই রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স তার সিন্ডিকেটের সদস্যদের ঘুষ না দিলে এই অফিসে একটি দলিলও নিবন্ধন হয় না। তার আঙ্গুলী হেলনে চলেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বাবু হাওলাদারের প্রধান প্রতিপক্ষ মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দু ভাই আওলাদ আকিবের অস্বাভাবিক উত্থানে কিছুটা পিছু হটেন বাবু হাওলাদার। জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে কিছুদিন টানা ৪-৫ মাস মাসে ২ একদিন ডিউটি করতেন। সে সময় আকিব আওলাদ নাটকীয়ভায়ে তাদের ভাড়াটে পুলিশ দিয়ে শতকোটি টাকার ওমেদার সোবহানকে ভূয়া মনগড়া মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠায় ৫ হাজার পিস ইয়াবা মামলা ও ডাকাতি মামলার ফেরারী আসামী আওলাদ ও তার ভাই আকিব। তবে এখন আবার সেই আওয়ামী আমলের ” এসো সবাই ভাগেযোগে খায়” সিস্টেমে চলছে এই সিন্ডিকেট।।

বাবু হাওলাদের বিষয়ে মাটি খুড়ে কেঁচো বেড় না হলেও বেড়িয়ে আসে কেউটে, ২০২০ সালে ১১ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানীতে হোটেল সুইট ড্রিমের বারে প্রায় সময় মদ্যপান করে টু এক্স( 2x) নৃত্য দেখতেন উমেদার বাবু হাওলাদার। সেখানে শেহজাদ খান ওরফে খায়রুল হাসানের (পিতাঃ নজরুল ইসলাম, মাতাঃ আয়েশা আক্তার, গ্রামঃ মধ্য ভাগলপুর, থানা: বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ) সাথে তার পরিচয় হয়, এক সাথে তারা মদ্যপান, নৃত্য উপভোগ ও খাবার খান, হোটেলের বিল হয় ৮ হাজার টাকা। এই বিল পরিশোধ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে তারা মারামারিতে লিপ্ত হন। হোটেলংৈখখখ  বিলের ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করেন বাবু। রাত সোয়া ৪ টার দিকে হোটেলের নিচে এলে তারা ফের মারামারিতে লিপ্ত হন। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন খায়রুল হাসান।

উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার খায়রুল হাসান কে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তখন বনানী থানায় একটি মামলা করা হয়। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ডিবি পুলিশ বাবুকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়। আদালতে সে সময় তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে। এতে বলা হয়েছিল, বাবুর মারধরে খায়ুরুলের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। এ হামলায় বাবু দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন, এতো কিছু হওয়ার পরেও তার বিরুদ্ধে আইজিয়ার অফিস ও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স এর ডিআর রহস্যজনক কারণে কোন ব্যবস্থা নেননি তখনকার সময়।

বাবু হাওলাদার তার কালোটাকা আর ক্ষমতা দিয়ে তার এই অপকর্মের ফাইল আজও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে দেননি বলে আলোচনা শোনা যায়।

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে আওয়ামী সরকারের আমলে উমেদার বাবু হাওলাদার ও সোবহান কে ঘুষ না দিলে এই অফিসে কোন দলিল নিবন্ধন হতোনা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে সেই আধিপত্যে ভাগ বসিয়েছে আওলাদ, আকিব ও হারিচ। তবে পূর্বের সেই আধিপত্য ফিরে পেতে বাবু হাওলাদার, সবুজ ও সোবহান গং কোটি টাকা খরচ করতেও প্রস্তুত। অপরদিকে আওলাদ, আকিব ও হারিচ গং রয়েছে সেফ ডিফেন্সে। তারা বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার আ: কাদিরের সামনেই প্রতিদিন পাবলিকের পকেট থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। পূর্বতন সাব রেজিস্ট্রার শাহিন মিয়া ঘুষ দুর্নীতির ৫০% নিজে রেখে দিতেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে মোহাম্মদপুরের বর্তমান সাব রেজিস্ট্রার আ: কাদির সিন্ডিকেট সেরেস্তার নামে আদায় হওয়া টাকার কতো পার্সেন্ট নিজের ঝুলিতে রাখেন তা এখনো জানা যায়নি। তবে সূত্রগুলো দাবি করেছেন তিনি কালেকশনকৃত টাকার ৪০% এবং দলিল মূল্যের উপর লাখে ১ হাজার দলিল প্রতি নিয়ে থাকেন। 

সোবহানের উত্থান ও অবৈধ সম্পদের খতিয়ান:

শতকোটি টাকার মালিক মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার আব্দুস সোবহান।
কাগজে-কলমে তিনি একজন সাধারণ উমেদার, দৈনিক ৬০ টাকা হাজিরাভিত্তিক মজুরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। কিন্তু বাস্তবে সেই ‘তুচ্ছ’ পদ কে ব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতি ও অনিয়মের এমন এক সাম্রাজ্য, যার ফলে তিনি আজ শতকোটি টাকার মালিক।
আব্দুস সোবহান ২০১৪ সালে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অস্থায়ী উমেদার হিসেবে যোগ দেন। ১১/১২ বছরের মধ্যে তিনি ও তাঁর পরিবারের নামে কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পাহাড় জমা করেছেন। দৈনিক ৬০ টাকা মজুরিতে নিযুক্ত একজন কর্মীর পক্ষে এমন সম্পদের মালিক হওয়া স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব, কিন্তু সোবহান সেই অসম্ভবকে বাস্তবে রূপ দিয়ে এলাকাবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের ঘুষ ও তদবির-বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি এই বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। শুধু তাই নয়, এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রশাসন ও গণমাধ্যমের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিও তাঁর কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করেন।

সোবহান, তাঁর স্ত্রী হালিমা এবং মায়ের আয়কর নথিতে বিপুল সম্পদের উল্লেখ রয়েছে। কাগজপত্র অনুযায়ী, তাঁদের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ১৫ কোটির বেশি। অথচ স্ত্রী ও মা দুজনেই গৃহিণী।
রাজধানীর আদাবরের সড়কের পাশে ২৪/৩ হোল্ডিং নম্বরে একটি সাততলা বাড়ির মালিক সোবহান।
আদাবরের ১০ নম্বর সড়কে ৭১২/১৯/৬৬ হোল্ডিংয়ে ৩.৫৯ কাঠা জমিতে ২৪টি ছাপরাঘর।
মোহাম্মদপুর সড়কের ১৭/বি, বি/এফ-এ ৫ শতাংশ জমিতে ১৮টি ছাপরাঘর (আরএস নং ২৪০, এসএ খতিয়ান নং ৫৯)।
বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায় ৫০ শতাংশ অংশীদারিত্বে ২ কাঠার একটি প্লট (সিএস খতিয়ান নং ২৯) এবং একই এলাকায় আরও ৬ শতাংশ জমি (এসএ নং ২৯৩)।
আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির ১১ নম্বর সড়কে ৬১৭ হোল্ডিংয়ের একটি ভবনে তাঁর তিনটি ফ্ল্যাট।
বছিলা সিটিতে ১৫ কাঠার একটি প্লট।
মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর মৌজায় ২০ কাঠা জমি।
কাঁটাসুর মৌজায় ৯৬৫৪ নং দলিলমূলে ১৮ কাঠার একটি প্লট।
আদাবরের ৩ নম্বর সড়কের ৩২২ হোল্ডিংয়ের “সিলিকন” ভবনের তৃতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট, যেখানে বর্তমানে তাঁর এক আত্মীয় থাকেন।

সম্পদ শুধু জমি বা ফ্ল্যাটেই সীমাবদ্ধ নয়। সোবহানের নামে তিনটি মাইক্রোবাস রয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী ও মা গৃহিণী হলেও আয়কর নথিতে বিপুল সম্পদের মালিক হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। এছাড়া শাশুড়ি ও অন্যান্য আত্মীয়দের নামেও সম্পদ কেনা-বেচার অভিযোগ রয়েছে।

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভেতরে সোবহানের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে অভিযোগ উঠেছে তিনি এই পদকে ‘আলাদিনের চেরাগে’ পরিণত করেছেন। একাধিক তদন্তেও তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও তদবির-বাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে বলে জানা গেছে। তবে বর্তমানে আওলাদ ও আকিব দুইভাইয়ের ষড়যন্ত্রে তিনি অফিসের মধ্যে বর্তমানে কিছুটা ব্যালেন্স করে চলার চেষ্টা করছেন।

দুই ভাই আওলাদ আকিবের সংক্ষিপ্ত খতিয়ান

দুই ভাইয়ের সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কব্জায় পরিণত হয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিস। অভিযোগ উঠেছে, দুই ভাই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করে দলিল জালিয়াতি ও দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে বছরের পর বছর চাকরি করে যাচ্ছেন। দুই ভাই হলেন, আওলাদ হোসেন ও আকিব হোসেন। তারা দুইজনই মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত এক্সট্রা মোহরার (নকলনবিস) হিসেবে কর্মরত।

সাব রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ১০ বছর ধরে নকলনবিস আওলাদ হোসেন একই অফিসে চাকরি করছেন এবং নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট দফতর। এসব অনিয়ম ঢাকতে তার ছোট ভাই মো. আকিব হোসেনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন পুরো অফিস। তেজগাঁও সাব রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু দলিল লেখক, স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও স্থানীয় কিছু চিহ্নিত দালালদের সমন্বয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেটের যোগসাজসে সরকারি নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে নানান ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন আওলাদ হোসেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নকলনবিস বৃহস্পতিবার (৩০ মে) সারাবাংলাকে জমি কেনাবেচার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি হচ্ছে বালাম বই আর আওলাদ হোসেন চাকরিতে যোগদানের পর হতে এখন পর্যন্ত কোনো বালাম বই সঠিকভাবে সম্পাদন করেননি। যার সত্যতা মিলবে যদি সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আওলাদ হোসেন বিভিন্ন সময় বালাম বই ঘষামাজা এবং ছিঁড়ে ফেলে সেবা প্রত্যাশীদের চাপের মুখে ফেলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।’

মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, নকলনবিস আওলাদ হোসেন বিভিন্ন দলিল লেখকদের স্বাক্ষর/সই নকল করেও বিভিন্ন অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতে নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, আওলাদ হোসেনের ছোট ভাই মো. আকিব হোসেন অবৈধ পন্থায় কোনো ধরনের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ক কাগজপত্রাদি ছাড়াই মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কাজ করে চলেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নাড়াচাড়া করছেন যা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এক নিকট আত্মীয় জানান, আওলাদ হোসেন আগে ইয়াবার ব্যবসা করতেন এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পাঁচ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন।

আওলাদ হোসেন তেজগাঁও কুনিপাড়ায় পাঁচতলা আলিশান বাড়ি, টঙ্গী, বাড্ডা, হাতিরঝিলে তার বাবার জায়গায় নিজের অর্থায়নে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি ও জমি ক্রয় করেছেন। সিলেটের সুনামগঞ্জে প্রায় তিন একরের বেশি জায়গার ওপরে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি মাছের ঘেরও করেছেন।
ইয়াবার মামলায় তিনি ২ নম্বর আসামি। ওই মামলায় আওলাদ তিন মাস জেলও খেটেছিল। এরপর ওই মামলায় তিনি খালাস পান। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর তেজগাঁও এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় একটি মামলা হয়। সেই মামলা আওলাদ হোসেন ৪ নম্বর আসামি। মামলাটির এখনো চার্জশিট হয়নি।

সাব রেজিস্টার সহকারী হারিচ

মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সাব রেজিস্টার আব্দুল কাদির এর কথিত সহকারী হারিচ এই অফিসের দুর্নীতিকে আরও সংগঠিত, পরিকল্পিত ও ভয়াবহ স্তরে নিয়ে গেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে সেবা গ্রহীতা ও দালালদের মুখে মুখে।

এখানে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল নিবন্ধনের প্রতিটি ধাপে ঘুষ বাধ্যতামূলক করেছেন হারিচ। কেউ ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখা হয় বা বিনা কারণে ত্রুটি দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। অফিসের দালাল চক্রকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়। যারা বাধ্য হয়ে ঘুষ দেন, তাদের কাজ অল্প সময়েই সম্পন্ন হয়—এ যেন প্রতিষ্ঠিত ‘দুর্নীতির কাস্টমার সার্ভিস’।

এই অফিসে দুর্নীতির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক পরিচালনায় সরাসরি সহায়তা করেন সাব রেজিস্টার সহকারী হারিচ। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা হারিচ গত কয়েক বছরে অবৈধভাবে আয় করেছেন কোটি কোটি টাকা—এমন অভিযোগ স্থানীয় সূত্রের। তার নিজ গ্রামে ইতোমধ্যে পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করেছেন, যার নির্মাণব্যয় তার বেতন-ভাতার সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। শুধু তাই নয়, রাজধানীর মিরপুর এলাকায় রয়েছে হারিচের নামে বাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাট। তার আর্থিক সাম্রাজ্য দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠছে।
মোহাম্মদপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন যে পরিমাণ ঘুষ লেনদেন হয় তার একটি বড় অংশ আসে হারিচের পকেটে। সাব রেজিস্ট্রার,ডিআর, আইজিআর অফিসের নামে হারিচ এসব টাকা নিজের বাসায় নিয়ে যান। হারিচ ব্যক্তিগত নির্দেশে ঘুষের হার নির্ধারণ থেকে শুরু করে দালালদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ সব তিনি নিজেই তদারকি করেন।
এই হারিচ, সোবহান, আওলাদ, বাবু হাওলাদার ও আকিব দলিল নিবন্ধনের মৌলিক সরকারি সেবাকে তারা ব্যক্তিগত লুটপাটের উৎসে পরিণত করেছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কোনো কঠোর তদারকি না থাকায় দুর্নীতিবাজদের দাপট আরও বেড়ে গেছে। যত দিন না এসব দুর্নীতির শিকড় উন্মোচন করে শাস্তির আওতায় আনা হবে, ততদিন সাধারণ মানুষের আর্থিক ও সামাজিক ভোগান্তি অব্যাহত থাকবে—এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।

পল্লবীর জসিম-রাজিবের কোটি টাকার সাম্রাজ্য


রাজধানীর তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পল্লবী জোনে বহু বছর ধরে চলছে দুর্নীতি, দালালি ও ঘুষের রাজত্ব। আর এর নেতৃত্ব দিচ্ছে কথিত ‘উমেদার সিন্ডিকেট’, যার মূল হোতা উমেদার জসিম। মাত্র ৬০ টাকা দৈনিক হাজিরার বেতন থেকে শুরু করে আজ তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক।

তার সঙ্গে আছেন আরেক উমেদার রাজিব, দু’জনে মিলে পুরো অফিসকে পরিণত করেছেন দুর্নীতির আখড়ায়।  সাব রেজিস্ট্রার জাহিদুল হকের সবুজ সংকেত পেয়ে ওমেদার রাজিব ও জসিম কথায় কথায় ঘুষ নেন। সন্ধ্যার পর সেরেস্তা আর বড়ো স্যারের ইফতারির নামে আদায়কৃত টাকা অর্ধেক সাব রেজিস্ট্রার কে দিয়ে বাকি টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। 

ঘুষের টাকা দিয়ে জসিম রাজধানীতে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট গড়ে তুলেছেন। উমেদার জসিমের জীবনের শুরুটা ছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। গার্মেন্টসে কাজ করতেন, সংসার চলত টানাপোড়েনে। পরে এক আত্মীয়ের সহায়তায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঝাড়ুদারের কাজ পান। তখন প্রতিদিন মাত্র ৬০ টাকা হাজিরা ছিল তার আয়। কিন্তু আজকের দিনে সেই জসিম রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি, জমিজমা ও বিদেশে ব্যবসার মালিক।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জসিমের রয়েছে—

মিরপুর শাহ আলীবাগ ৩৭/এ নম্বর বাড়িতে তিনটি ফ্ল্যাট

মিরপুর গার্ডেনে শাশুড়ির নামে এক কোটি টাকার ফ্ল্যাট

সাভার মসূরীখোলা এলাকায় ১৫-২০ শতাংশ জমি

ময়মনসিংহ ভালুকায় গরুর খামার

সৌদি আরবে যৌথ ব্যবসা

দামি হাইয়েস মাইক্রোবাস ও নোয়া গাড়ি (ভাই গিয়াস উদ্দিনের নামে)

গ্রামে (শরীয়তপুর ভেদরগঞ্জ) একাধিক জমি ও পাকা বাড়ি

এলাকাবাসীর মতে, এসব সম্পদের বাজারমূল্য কয়েক দশক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ জসিমের অফিসিয়াল আয় এখনও দৈনিক মাত্র ৬০ টাকা।

চায়ের ফেরিওয়ালা থেকে কোটিপতি উমেদার রানার হাতে ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের চাবিকাঠি

ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রি অফিসের ওমেদার রানা আহাম্মেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলিল দাতা-গ্রহিতা ও দলিল লেখকদের জিম্মি করে প্রতিদিন অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এছাড়াও ওমেদার রানা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী, পিওন ও নকল নবীশদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে রেখেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ কোন টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৭/৮বৎসর পূর্বে এই রানা রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে চা বিক্রি করতো। তখন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের দুর্নীতিবাজ টাইপিষ্ট মতিউর রহমান সাবেক জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল জলিলকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ধানমন্ডি অফিসের ওমেদার পদে নিয়োগ দেয়। তার কিছুদিন পরই ওমেদার রানা নানাভাবে জনহয়রানী করে দুর্নীতির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া শুরু করে। জনহয়রানী ও উৎকোচের অভিযোগে ওমেদার রানাকে ঢাকার তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার দিপক কুমার সরকার, আশুলিয়া অফিসে বদলী করে। ৩ মাস পর অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে পূনরায় রানা ধানমন্ডি অফিসে যোগদান করে অফিসটি ঘুষ দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছে। এদিকে রানা ধানমন্ডি অফিসে ওমেদারী করে কয়েক কোটি টাকা অবৈধ উপার্জন করে
হাতিরঝিল মহানগর হাউজিংয়ে ৩য় তলায় কেনা ১৮শ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
এই বিল্ডিংয়ে তার আরো একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া রামপুরা বনশ্রীতে ৪তলা বিলাসবহুল বাড়ির ও মালিক হয়েছেন।
তার গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভুইয়ায় কিনেছেন প্রায় ৩০ একর জমি ও ৫টি দোকান।
শুধু তাই নয় ৩টি হাইয়েছ মাইক্রো কিনে রেন্ট এ কার’এ ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। নিজে বিলাসবহুল প্রাইভেট কারে ও চলাফেরা করে থাকেন।

উত্তরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে মানিক ও মঞ্জুর কথায় শেষ কথা

ঢাকা তেজগাঁও রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স উত্তরা সাব রেজিস্ট্রার অফিস বহু বছর ধরে ঘুষ দুর্নীতি ও জাল জালিয়াতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ক্রেতা বিক্রেতারা দলিল করতে গেলেই ধরা পড়তে হয় সিন্ডিকেটের হাতে। উত্তরা অফিসে ৭ সদস্যের সিন্ডিকেটের প্রধান হলো নকল নবীশ মানিক ও ঝাড়ুদার মঞ্জু।

তাদের হাতে জিম্বি হয়ে পড়েছে সাব রেজিস্ট্রার, দলিল লেখক, উমেদার, পিয়ন থেকে ক্রেতা বিক্রেতারা। এই অফিসে যার মাধ্যমে দলিল করতে যাক না কেনো সেই দলিলের ৫% অতিরিক্ত ঘুষ দিতে হয় এই নকল নবীশ মানিক ও ঝাড়ুদার মঞ্জুদের।
উমেদার রাজু ও নকল নবীশ মোবারক ব্যক্তিগত ঝামেলায় দীর্ঘ ১০ বছর অফিসে অনুপস্থিত ছিল।তারা অফিসে ১০ বছর কোন কাজ করেননি। এমনকি হাজিরাও দেননি অথচ ওই ২ জনের নিকট থেকে মহিউদ্দিন মানিক, তৎকালীন সময়ের সাব রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লা ও ঝাড়ুদার মঞ্জু মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনরূপ অনুমোদন না নিয়েই দীর্ঘ ১০ বছর পর পুনরায় কাজ করার অনুমতি দিয়ে কাজে যোগাদান করিয়েছে।

ঝাড়ুদার মঞ্জু উত্তরা অফিসের জাল দলিলে নিরীক্ষার কাজ করে তৎকালীন সময়ের সাব রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লার সাথে শলা পরামর্শ করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দলিল করিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সেই সময়ের কিছু দলিল নং ৪৬২০ ও ৪৬২২ বলে জানা যায়। অতি আশ্চর্য বিষয় হল ঝাড়ুদার মনজুরুল হক মঞ্জুর নিজের ঝাড়ুদার হয়েও তার আপন ভায়রার ছেলে রাজীবকে ঝাড়ুদার পদে চাকরি দিয়েছেন। রাজিব কে প্রতিদিন ১০০০ (এক হাজার টাকা) করে দিয়ে থাকেন মঞ্জু। অথচ তার দৈনিক হাজিরা হচ্ছে মাত্র ৬০ (ষাট টাকা)। জীবন নামে আরেকটি ছেলেকে সরকারি চাকরি হিসেবে রেখেছে তার কাজ হচ্ছে ক্রেতা বিক্রেতারা দলিল করতে আসলে সেই দলিল ধরে মঞ্জুকে দেওয়া। সেই বাবদ জীবনকে দৈনিক ১০০০ (এক হাজার টাকা) হাজিরা দিয়ে থাকে মঞ্জু।

এইসব দুর্নীতি করে ঝাড়ুদার মঞ্জু গড়ে তুলেছেন উত্তরায় কামাড়পাড়ায় আলিশিয়ান ৭ তলা ভবন ও ১টি ৬ তলা ভবন। নামে বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। চলেন বিলাস বহুল গাড়িতে যার মূল্য ৬০ লাখ টাকার উপড়ে।
অতি আশ্চর্য বিষয় হলো এই ঝাড়ুদার মঞ্জুর দৈনিক হাজিরা হচ্ছে মাত্র ৬০ টাকা অর্থাৎ (৬০×২৫=১৫০০ শত টাকা) যার মাসিক ইনকাম ১৫০০ শত টাকা সে কি ভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন ??

দুদকের চোখে ধুলা দিয়ে এই ভাবেই অবৈধ সম্পদ করে তুলছেন নকল নবীশ মানিক ও ঝাড়ুদার মঞ্জু অথচ ঝাড়ুদার মঞ্জুর নিয়োগ পত্রটি ভূয়া ও জাল। কারণ মঞ্জুরুলের নিয়োগ অনুমোদনটি নিবন্ধন অধিদপ্তরের কোন আইজিআর প্রদত্ত নয়। সেটা আছে তৎকালীন জেলার রেজিস্ট্রার প্রণব কুমার ভৌমিকের নামে ১১/০৯/১১ ইং তারিখে স্বাক্ষর করা। ওই সাক্ষরটি আজও আসল কিনা তাও সন্দেহজনক।

ঝাড়ুধার মঞ্জুর বিরুদ্ধে পতিত আওয়ামী লীগের সময় তার ছেলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে উত্তরায় মিছিল মিটিং ভাংচুর করতো। ৫ই আগষ্ট আওয়ামী লীগ পতনের পর ছাত্র জনতা তার বাসায় সেনাবাহিনী সহ অভিযান চালিয়ে দেশীয় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে কিন্তু ভাগ্য ভাল থাকায় তার ছেলে পালিয়ে যায়।

(এরপর আগামীকাল দ্বিতীয় পর্বে পড়ুন ৩ জনের আমলনামা) 

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক

Recent Posts

৩ হাজার পিস ইয়াবা সহ এনসিপির আরিফুল গ্রেফতার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩ হাজার পিস ইয়াবাসহ মো.…

1 hour ago

দুর্নীতির মামলায় সাবেক আইজিপি বেনজীরের বিচার শুরু

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: ১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি)…

3 hours ago

নিখোঁজের তিন দিন পর ধান ক্ষেতে মিললো শিশুর লাশ, হত্যার অভিযোগ পরিবারের

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় নিখোঁজের তিন দিন পর ফাতেমা আক্তার পলি নামে এক শিশুর মরদেহ…

3 hours ago

আলমডাঙ্গায় ডিএনসি’র ঝটিকা অভিযান: লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বের হলো ৪৫ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় মাদক লুকানোর এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেও শেষ রক্ষা হয়নি মো.…

7 hours ago

সিলেটে শ্রমিক তোপে বিতাড়িত সেই ডিডি সানাউল: চট্টগ্রামে গড়েছেন দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্য ‘রাজত্ব’

বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ থানাধীন বালুচরা এলাকায় অবস্থিত বিআরটিএ (মেট্রো-২ সার্কেল) কার্যালয়টি এখন…

7 hours ago

ঝিনাইদহে বাসে র‍্যাবের বড় অভিযান: পরিত্যক্ত ব্যাগ থেকে মিলল সাড়ে ৭ কোটি টাকার ‘আইস’

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহ জেলা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে প্রায়…

19 hours ago