বাঘাইছড়ি পৌরসভায় ইজিপি টেন্ডারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: লাইসেন্স জব্দ রেখে পৌনে এক কোটি টাকার কাজ ১৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা
বাঘাইছড়ি পৌরসভায় এডিবির আওতায় পৌনে এক কোটি টাকার ৬টি গ্রুপ উন্নয়নকাজ নিয়ে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটবাজির অভিযোগ উঠেছে। নবায়নের জন্য আবেদন করা ঠিকাদারি লাইসেন্স ইচ্ছাকৃতভাবে জব্দ রেখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আমেনা মারজান, ওয়ার্স্ট্যান্ড আশিকুর রহমান মানিক, লাইসেন্স পরিদর্শক মাসুম হোসেনসহ প্রভাবশালী একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে কাজ ভাগবাটোয়ারা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাঘাইছড়ি পৌরসভা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া লুটপাট ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারের ধারাবাহিকতা ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক পরিবর্তন হলেও তা বন্ধ হয়নি।
সম্প্রতি পৌরসভায় এডিবির আওতায় পৌনে এক কোটি টাকার ৬টি গ্রুপ কাজের জন্য ইজিপি (e-GP) সিস্টেমে অনলাইন টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডার ড্রপের শেষ তারিখ ছিল ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫।
কাজের ৬টি গ্রুপ:
১) ০১ নম্বর ওয়ার্ডে মাস্টারপাড়া থেকে কাচালং ডিগ্রি কলেজ সড়ক পর্যন্ত আরসিসি সড়ক নির্মাণ।
৩) ০৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাচালং কলেজে শহীদ মিনার এবং ০১ নম্বর ওয়ার্ডে বায়তুস শরফ মাদ্রাসা থেকে কাচালং ডিগ্রি কলেজ পর্যন্ত আরসিসি সড়ক নির্মাণ।
৪) ০৬ নম্বর ওয়ার্ডে বটতই–হেডম্যানপাড়া প্রধান সড়ক এবং ০৪ নম্বর ওয়ার্ডে বাঘাইছড়ি সদর উপজেলা কবরস্থানের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ।
৫) ০১ নম্বর ওয়ার্ডে চৌমুহনী থেকে রিভারঘাট পর্যন্ত আরসিসি সড়ক নির্মাণ।
৬) ০২ নম্বর ওয়ার্ডের চৌমুহনী ও মুসলিম ব্লকে ওভারহেড ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ।
অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডার ঘোষণার পর থেকেই প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট একটি সিন্ডিকেট পৌর প্রশাসকের সঙ্গে আঁতাত করে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে নেয়। লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করা ঠিকাদারদের লাইসেন্স বই জব্দ করে রাখা হয়, যাতে তারা ইজিপিতে টেন্ডার ড্রপ করতে না পারেন।
বিশেষ করে যাদের ইজিপি অ্যাকাউন্ট নেই, তাদের নতুন লাইসেন্স ও নবায়নের জন্য আবেদন করা লাইসেন্স বই আটকে রেখে টেন্ডার ড্রপের সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয় এবং তার সত্যতাও মিলেছে। তবে ৮ ডিসেম্বর শুধুমাত্র যেসব লাইসেন্স টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না, সেগুলোই বিতরণ করা হয়।
এছাড়া বিতরণ করা কিছু লাইসেন্স বইয়ে তারিখের ওপর ওভাররাইটিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। ১৩/১২/২০২৫ তারিখকে ওভাররাইটিং করে ০৩/১২/২০২৫ করা হলেও বইগুলো বিতরণ করা হয় ৮/১২/২০২৫ তারিখে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় করে যেসব ব্যক্তি আগেই লাইসেন্স নবায়ন করিয়ে রেখেছিলেন, তারাই কেবল ইজিপিতে টেন্ডার ড্রপ করতে পেরেছেন।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, নবায়নের জন্য আবেদন করা লাইসেন্সগুলোর মধ্যে ১৩টি লাইসেন্স জব্দ রেখে পৌরসভার ওয়ার্কস্ট্যান্ড আশিকুর রহমান মানিক, লাইসেন্স পরিদর্শক মাসুম হোসেন, ঠিকাদার রহমতুল্লাহ খাজা, ওমর আলী, পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজানসহ গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট গত ১২ ডিসেম্বর গোপন বৈঠকে পৌনে এক কোটি টাকার কাজ মোট ১৮/১৯ জনের মধ্যে ভাগাভাগি করে।
ভাগ পাওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান:
আওয়ামী লীগ নেতা ও ৫নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ত্রিদিব দাশ প্রকাশ কিনাম, যুবলীগ নেতা মোঃ হোসেন, রহমতুল্লাহ খাজা, আব্দুল সবুর, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নুর আলম, ইসলামী ব্যাংক (এজেন্ট ব্যাংকিং) বাঘাইছড়ি শাখার স্বত্বাধিকারী নুর আলম পনির, বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাব সভাপতি ও ঠিকাদার আবদুল মাবুদ, ওমর আলী, ওমর ফারুক, জুপিটার চাকমা, বেলাল মিস্ত্রী, মোঃ ইলিয়াছ, আওয়ামী লীগ নেতা ধানবি চাকমা, রাইস মিল মালিক ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলম, নবদ্বীপ চাকমা, জেলা ছাত্রদলের কার্যনির্বাহী সদস্য নাহিদুল আলম, উপজেলা ছাত্রদল নেতা ইকবাল।
উল্লেখিত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬ গ্রুপের মোট ৮৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার কাজ ভাগাভাগি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও জানা গেছে, জব্দ রাখা ১৩টি লাইসেন্সের মধ্যে আওয়ামী লীগের কয়েকজন স্থানীয় নেতার লাইসেন্সও রয়েছে, যাদের ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ঠিকাদারি মহল ও সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, এভাবে লাইসেন্স জব্দ রেখে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হলে ইজিপি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকল্পে এমন অভিযোগ ওঠায় উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।