সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এবার অগ্নি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো গুদাম, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা, রাজধানীর মিরপুর ও কেরানীগঞ্জের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর পর থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন থেকে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়া হবে না; প্রতিদিন চলছে অগ্নিনির্বাপণ মহড়া, সরঞ্জাম পরীক্ষা এবং কর্মীদের বাস্তব প্রশিক্ষণ।
গত কয়েক মাসে দেশে যেসব অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, সেগুলো একটির পর একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো গুদামে আগুনে প্রায় ৮০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তার আগের মাসে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি কনটেইনার ইয়ার্ডে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে চার শ্রমিক আহত হন। জুলাইয়ে মিরপুরের একটি প্রসাধনী গুদামে আগুনে পাঁচজন প্রাণ হারান, আর জুনে কেরানীগঞ্জের একটি প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন সাতজন।
বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আগে সপ্তাহে একদিন শনিবার অগ্নি নির্বাপণ মহড়া অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, দুর্ঘটনা যে কোনো সময় ঘটতে পারে। তাই এখন প্রায় প্রতিদিনই বন্দরের ভেতরে মহড়া চলছে। এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছেন বন্দরের কর্মকর্তা, কাস্টমস কর্মকর্তা, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মচারীরা।
বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭শ থেকে ৮শ ট্রাক আমদানি-রপ্তানিপণ্য ওঠানামা করে। এসব পণ্যের বড় অংশই দাহ্য ও রাসায়নিকজাত, যেমন প্লাস্টিক, প্রসাধনী, রাবার, তেল, ফোম, দ্রবণীয় কেমিক্যাল ও অন্যান্য শিল্পজাত পদার্থ। এইসব পণ্য দিনের পর দিন বন্দরের গুদামগুলোতে জমা থাকে। অথচ এসব গুদামের বড় অংশই দাহ্য পদার্থে ভরপুর।
আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ী ফারুক ইকবাল ডবলু বলেন, ‘ঢাকা বিমানবন্দরের আগুন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন সবাই ভয়ে আছে। তবে বেনাপোল কর্তৃপক্ষ যেভাবে প্রতিদিন মহড়া করছে, তা আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।’
আরেক ব্যবসায়ী মারুফ হোসেন বলেন, ‘আগে বন্দর এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা ছিল না। এখন প্রতিদিন ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতি দেখা যায়, প্রশিক্ষণ চলছে। এটা সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’
স্থলবন্দর হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৯২৫-এর সভাপতি তবিবুর রহমান তবি বলেন, ‘আগে অনেক শ্রমিক মহড়ায় অংশ নিতে অনীহা দেখাতেন। কেউ কেউ ভাবতেন এটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা। এখন সবাই বুঝেছে আগুনের ভয় কতটা বাস্তব। সামান্য ভুলেই বড় বিপদ হতে পারে। তাই সবাই এখন গুরুত্ব দিয়ে অংশ নিচ্ছে।’ এছাড়াও তিনি বলেন, ‘গুদামে প্রচুর পলিথিন, কার্টন, প্যাকেজিং সামগ্রী ও রাসায়নিক দ্রব্য থাকে, যা খুব দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। আমরা এখন গুদামে শর্ট সার্কিট বা গরম যন্ত্রপাতি দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করছি। প্রশাসনও সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
সম্প্রতি বন্দরের অগ্নি নিরাপত্তা জোরদারে একটি ‘অগ্নি নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে। বেনাপোল বন্দর, কাস্টমস, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্স প্রতি সপ্তাহে বৈঠক করছে এবং বন্দর এলাকার প্রতিটি স্থাপনার ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে। কোনো গুদামে পুরনো বৈদ্যুতিক লাইন বা ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংস্কার বা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী নাজিব হাসান মুঠোফোনে জানান, বেনাপোল বন্দর জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আমরা চাই এখানে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটুক। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে।
বেনাপোল বন্দর পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য বড় সতর্ক সংকেত। আমরা কোনোভাবেই ঝুঁকি নিতে চাই না। প্রতিদিন মহড়া চলছে, প্রতিটি গুদামে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র যাচাই করা হচ্ছে এবং পুরনো যন্ত্রগুলো পরিবর্তন করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগুন প্রতিরোধে এখন আমরা শতভাগ প্রস্তুত। তবে সচেতনতা ছাড়া কোনো প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়। আমরা চাই সবাই দায়িত্বশীল হোক, হোক সে শ্রমিক, ব্যবসায়ী বা কর্মকর্তা।’