রাজবাড়ী বিআরটিএ কার্যালয় দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন এডি নাসির উদ্দিন

রাজবাড়ী শহরের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয় এখন যেন সরকারি দপ্তর নয়, বরং সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন) মো. নাসির উদ্দিন-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক দুর্নীতির অভয়ারণ্য। দালাল ছাড়া কোনো কাজ হয় না— এমন অভিযোগ এখন রাজবাড়ী শহরের প্রতিটি চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মুখে মুখে।
অফিসের প্রতিটি স্তরে টাকার লেনদেন যেন ‘নিয়মিত প্রক্রিয়া’। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ— অফিসের কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন দালাল চক্রকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, আর তার ছত্রছায়ায়ই চলছে লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন ও কাগজ নবায়নের নামে ঘুষ বাণিজ্য।
“টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না” : গোয়ালন্দ মোড় এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন শেখ বলেন, “এক বছর আগে গাড়ির কাগজের জন্য অফিসের লোকজনের কথায় আক্রামুজ্জামান নামের এক দালালকে ৮ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছিলাম। কাজ হয়নি, তাই টাকা ফেরত চাইতে গেলে তারা আমাকে অফিসেই মারধর করে।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অফিসের কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন সব জানেন, কিন্তু কিছুই করেন না। কারণ দালালরা তারই আশীর্বাদে চলছে।” সুমনের এই অভিযোগের সঙ্গে মিলছে আরও অনেকের বয়ান।
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন বলেন, “আমার ভারী লাইসেন্স হালকা করতে আক্রামুজ্জামান ৮ হাজার টাকা চায়। আমি ৬ হাজার দেই, দুই বছরেও কাজ হয়নি। এখন ফোন ধরেও না। নাসির স্যারকে বললে উনি বলেন, ‘ওর সঙ্গে হিসাব মিটিয়ে নেন’। এটা কেমন কথা?”
দালাল চক্রের হোতা আক্রামুজ্জামান, পৃষ্ঠপোষক নাসির উদ্দিন : রাজবাড়ী বিআরটিএ অফিসে দালাল আক্রামুজ্জামানকে সবাই “সিল কন্ট্রাক্টর” নামে চেনেন। সরকারি চাকরি না করেও তিনি যেন পুরো অফিসের নিয়ন্ত্রক। স্থানীয় সূত্র জানায়, সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিন তাঁকেই ব্যবহার করে সব অনিয়মের সুবিধা নেন। অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নাসির স্যার জানেন, কে কোথায় ঘুষ নিচ্ছে। আক্রামু কাজ না করলে কোনো ফাইল চলে না। ভাগাভাগি হয় নিয়ম মাফিক।” আরও জানা যায়, লাইসেন্স পরীক্ষায় ফেল করিয়ে পরে দালালের মাধ্যমে টাকা নিলে পাস করানো হয়। “এটা সবাই জানে,” বলেন এক আবেদনকারী, “তিনবার ফেল করানোর পর ১৯ হাজার টাকা দিতে হয়। দেড় বছরেও কাজ হয়নি।”
দুদকের অভিযানের পরও ফের সক্রিয় চক্র : এই দালাল-নাসির যোগসাজশের বিরুদ্ধে দুদক ফরিদপুর আঞ্চলিক কার্যালয় গত ৭ মে অভিযান চালায়। সহকারী পরিচালক মো. মোস্তাফিজের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে দালাল আক্রামুজ্জামানসহ চারজনকে আটক করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে ৭২ হাজার ৪২০ টাকা উদ্ধার করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ- “নাসির উদ্দিনের প্রভাবেই” সেই অভিযানের পর খুব দ্রুতই গ্রেপ্তাররা জামিনে মুক্ত হয়ে ফের আগের মতো সক্রিয় হয়ে পড়ে।
গোয়ালন্দের বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বলেন, “যে অফিসে দুদক অভিযান চালায়, সেই অফিস আবার আগের চেহারায় ফিরে আসে— এটা সম্ভব হয়েছে নাসির উদ্দিনের মদদেই।”
কোটি টাকার আক্রাম, আরামদায়ক কর্মকর্তা : আক্রামুজ্জামান এখন রাজবাড়ী শহরের অন্যতম বিত্তশালী ব্যক্তি। ২ নম্বর বেড়াডাঙ্গায় দুইতলা বাড়ি, জাপানি প্রাইভেট কার, এবং সজ্জনকান্দায় ১ কোটি ২৬ লাখ টাকায় কেনা ভবন— সবই এই ‘সিল কন্ট্রাক্টর’-এর নামে। স্থানীয়রা বলছেন, এই সম্পদের পেছনে নাসির উদ্দিনেরও আর্থিক স্বার্থ রয়েছে। একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বলেন, “আক্রাম একা এতটা সাহস পেত না, যদি নাসির উদ্দিন তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতেন। দুজনের সম্পর্কটা ‘অফিসিয়াল নয়, ব্যবসায়িক’।”
বিআরটিএ রাজবাড়ী অফিসের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন) মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “আক্রামুজ্জামান বিআরটিএর কেউ নন। তিনি বহিরাগত। সেবাগ্রহীতাকে মারধরের বিষয়ে এডিএম স্যার আমাকে জানিয়েছেন। আমি বর্তমানে বাইরে আছি, পরে বিস্তারিত জানাব।” তবে এই বক্তব্য স্থানীয়দের আরও ক্ষুব্ধ করেছে। একজন সেবাগ্রহীতা বলেন, “একজন সহকারী পরিচালক যদি জানেন না কে তার অফিসে দালালি করছে, তাহলে তিনি দায়িত্বে থাকার যোগ্যতা রাখেন?” আরেকজন যোগ করেন, “নাসির স্যারের ‘বাইরে আছি’ কথাটা আসলে দায় এড়ানোর কৌশল। তিনি থাকেন ভেতরেই— শুধু দায় নিতে বাইরে যান।” রাজবাড়ী সদর উপজেলার এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “বিআরটিএ অফিসের অনিয়মে সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তিনি যদি কঠোর অবস্থান নিতেন, বহিরাগত দালালরা কখনো এমন সাহস পেত না।” বিশ্লেষকদের মতে, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তার অধীনস্থ অফিসে অনিয়ম জানলে তা রোধ করার দায়িত্ব তারই। কিন্তু নাসির উদ্দিন সেটি না করে বরং দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করেছেন— যার ফল আজ এই চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা।
প্রতিদিন শত শত মানুষ রাজবাড়ী বিআরটিএ অফিসে যান রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্স নবায়ন বা গাড়ির কাগজের জন্য। কিন্তু ফিরে আসেন ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে। স্থানীয় বাসচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা সরকারি অফিসে যাই, কিন্তু মনে হয় দালালের অফিসে ঢুকেছি। টাকা ছাড়া কোনো কথা নেই।” আরেকজন বলেন, “নাসির উদ্দিন দালালদের চেয়েও বড় সমস্যা। তিনি না থাকলে হয়তো এই দালালরা টিকতে পারত না।”
রাজবাড়ী সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল করিম শেখ বলেন, “এই অফিসের মূল সমস্যা প্রশাসনিক নৈতিকতা। যত দিন সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হবে, তত দিন দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে না।”
তিনি আরও বলেন, “দুদক একদিন অভিযান চালিয়ে থেমে গেছে। এখন প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি ও দায়ী কর্মকর্তার বদলি।”
রাজবাড়ী বিআরটিএ অফিস আজ দুর্নীতির প্রতীক। দালাল আক্রামুজ্জামান কেবল একজন পুতুল; আসল সুতো টানেন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন) মো. নাসির উদ্দিন। তার প্রশাসনিক উদাসীনতা ও নৈতিক দুর্বলতার কারণেই আজ সাধারণ মানুষ সেবা নয়, হয়রানির শিকার হচ্ছে।
রাজবাড়ীর মানুষ এখন একটাই দাবি তুলেছে- “দালাল নয়, নাসির উদ্দিনকেই জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।”

অতনু বর্মণ

Recent Posts

মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, ছাত্রী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা

নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীর ধর্ষণের…

7 hours ago

চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন, অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন যাত্রীরা

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় চলন্ত যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে দ্রুত…

9 hours ago

হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে: ত্রাণমন্ত্রী

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তিন মাসের…

9 hours ago

শপথ নিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।…

9 hours ago

বাধ্যতামূলক অবসরে পুলিশের ১৬ ডিআইজি

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে বাধ্যতামূলক অবসরের আওতায় বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে…

12 hours ago

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড:ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ মিলেছে

সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের…

12 hours ago