প্রায় সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট।
ভিপি (সহসভাপতি) পদে মোস্তাকুর রহমান (জাহিদ) এবং জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে সালাউদ্দিন আম্মার নির্বাচিত হয়েছেন।
শুক্রবার সকালে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ. নজরুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন।
সাড়ে তিন দশক পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতেই বিজয়ী হয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চাকসু) ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যেমন ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা আধিপত্য বিস্তার করেছে, রাকসুতেও দেখা গেল সেই ধারাবাহিকতা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি ছিল ১৭তম রাকসু নির্বাচন। ১৯৯০ সালের পর থেকে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে বন্ধ ছিল ছাত্র সংসদ নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরে এত দীর্ঘ সময় ধরে ভোট না হওয়ার রেকর্ডও এর আগে ছিল না।
তাই এবারের নির্বাচনকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল সবাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি ভবনের ১৭টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়। ১৭টি হলের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।
নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৫৯৬ জন ছাত্র এবং ১১ হাজার ৩০৫ জন ছাত্রী।
ভোট পড়েছে ৬৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যার মধ্যে ছাত্রী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল ৬৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ভোট গণনা শুরু হয়। রাত সাড়ে দশটার দিকে নারী হলের ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়।
দীর্ঘ রাত জেগে শুক্রবার সকাল ৯টায় মিলনায়তনের মঞ্চে বসেন নির্বাচন কমিশনার ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা।
সকাল নয়টা নাগাদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা শুরু করেন।
এ সময় মিলনায়তন শিক্ষার্থী, প্রার্থী ও সমর্থকে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফল ঘোষণার মুহূর্তে বিজয়ী মোস্তাকুর রহমান, সালাউদ্দিন আম্মার ও এস এম সালমান সাব্বির ‘বিজয় চিহ্ন’ দেখিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
ভিপি পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মোস্তাকুর রহমান (জাহিদ) সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন ১২ হাজার ৬৮৭টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছাত্রদল সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম প্যানেলের শেখ নুরু উদ্দিন (আবির) পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৯৭ ভোট।
জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে আধিপত্য বিরোধী ঐক্য প্যানেলের সালাউদ্দিন আম্মার বড় ব্যবধানে বিজয়ী হন। তিনি পান ১১ হাজার ৪৯৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি শিবির সমর্থিত আরেক প্রার্থী ফজলে রাব্বি মো. ফাহিম রেজা পান ৫ হাজার ৭২৭ ভোট।
এজিএস (সহ-সাধারণ সম্পাদক) পদে শিবির সমর্থিত প্যানেলের এস এম সালমান সাব্বির নির্বাচিত হন। তিনি পান ৬ হাজার ৯৭৫ ভোট, আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের জাহিন বিশ্বাস (এষা) পান ৫ হাজার ৯৫১ ভোট।
ভোটের দিন সকাল থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ ছিল। ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা ভোট দেন।
তবে দুপুরের পর থেকে কয়েকটি হলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওঠে, কিছু কেন্দ্রে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়। তবে বড় কোনো সহিংসতা ছাড়াই বিকাল চারটায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ. নজরুল ইসলাম বলেন, `কঠোর এবং দৃঢ় প্রশাসনিক সহযোগিতার কারণেই এই নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা দারুণ অংশগ্রহণ করেছে তাদের গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলনই এই নির্বাচন।‘
তিনি আরও বলেন, ৩৫ বছর পর হওয়া এই নির্বাচনের সার্থকতা আমি আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের উৎসর্গ করছি।
চূড়ান্ত ফল ঘোষণার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, `রাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক অনুশীলনের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ নির্বাচনের প্রক্রিয়া সুষ্ঠু রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে।‘
উপাচার্য ছাড়াও সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন খান, অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল আলীম ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমিরুল ইসলামসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
রাকসু নির্বাচনে মোট ১০টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ২৩টি পদে প্রার্থী ছিলেন ২৪৭ জন। হল সংসদের ১৫ পদে ১৭টি হলে মোট ৫৯৭ প্রার্থী এবং সিনেট প্রতিনিধি নির্বাচনের ৫ পদে ৫৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ১৮ জন, জিএস পদে ১৩ জন এবং এজিএস পদে ১৬ জন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে, তবে দু-একটি হলে কিছু অভিযোগ পাওয়া যায়।
ফল ঘোষণার পর ছাত্রদল সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম প্যানেলের সদস্যরা ফলাফলকে মেনে নেওয়ার পাশাপাশি কিছু কেন্দ্রের ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান। তাদের দাবি, কিছু হলে ইভিএমে ‘কারিগরি ত্রুটি’ ছিল।
অন্যদিকে, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন যে, প্রচারণায় প্রশাসন ও কিছু শিক্ষকদের ভূমিকা পক্ষপাতদুষ্ট ছিল।
প্রধান নির্বাচন কমিশন এফ. নজরুল ইসলাম বলেন, “সব অভিযোগ আমরা পর্যালোচনা করব। তবে প্রাথমিকভাবে ভোটে কোনো অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি।“
ফল ঘোষণার পর কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে আনন্দ মিছিল বের করেন শিবির সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের সদস্যরা।
তারা “ঐক্যের জয়”, “শিক্ষার গণতন্ত্র চাই” ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন।
বিজয়ী ভিপি মোস্তাকুর রহমান বলেন, `৩৫ বছর পর যে নির্বাচন হলো, তা শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার প্রতীক। আমরা বিশ্বাস করি, রাকসু আবার শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করবে।‘
নির্বাচিত জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, `আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি কোনো রাজনৈতিক হিংসা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।‘
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চাকসু) ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা প্রভাব বিস্তার করেছিল।
বিশেষত চাকসুর নির্বাচনে ২৬টির মধ্যে ২৪টি পদে জয় পায় শিবির প্যানেল।
বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রশিবিরের ধারাবাহিক সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে।
তারা বলছেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে সংগঠনটি এখনো শিক্ষার্থী মহলে সংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে আছে।
রাজনীতি পর্যবেক্ষক অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, `যেখানে অন্য সংগঠনগুলো তাদের জনসম্পৃক্ততা হারিয়েছে, সেখানে শিবির ধারাবাহিকভাবে সংগঠিত থেকে গেছে। রাকসুর ফল সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করছে।‘
শিক্ষার্থীরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই রাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা নতুন করে শুরু হবে।
পূর্বে ছাত্র রাজনীতির সহিংসতা, দখলদারিত্ব ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ ছিল। নতুন রাকসু সেই চিত্র পাল্টাতে পারবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে, শিক্ষার্থীরা পরিপক্ব ও শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারে। প্রশাসন ভবিষ্যতেও এমন নির্বাচন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবে।‘
৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রাকসু নির্বাচন শুধু একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয় বরং দেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রত্যাবর্তনের বার্তাও বয়ে আনল।
ডাকসু, জাকসু, চাকসুর পর এবার রাকসুতেও ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুল জয় বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
যেখানে প্রশ্ন থেকে গেল, এই ঐতিহাসিক সাফল্য কি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে রূপ নেবে, নাকি তা হবে কেবল আরেকটি রাজনৈতিক প্রতীকের জয়?
নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীর ধর্ষণের…
লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় চলন্ত যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে দ্রুত…
সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তিন মাসের…
সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।…
সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে বাধ্যতামূলক অবসরের আওতায় বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে…
সংবাদ প্রতিদিন ডেস্ক: ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের…