ইউরোপীয় জাহাজ থেকে শুরু করে ছোট নৌযান সব মিলিয়ে বিশ্বজোড়া সমবেত উদ্যোগ গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে গাজার উপকূলের দিকে এগুচ্ছে, সেখানে চলে যাচ্ছে সামান্য হেলথ কিট, শুকনো খাবার ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আলোকচিত্র ও প্রত্যক্ষতার মাঝ দিয়ে বিশ্বের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য।
কিন্তু মরসুমান্তরে ইসরায়েল নেভি বুধবার রাতে ১৩টি নৌযান আটক করার কথা জানায়।
২০১ জনেরও বেশি আটক এবং তারা ৩৭টি দেশের নাগরিক বলে দাবি করেছেন, স্পেন, ইতালি, তুরস্ক ও মালয়েশিয়া।
এ ঘটনাটিই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে কেন মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তোলা, কেন প্রতিদিন নিরীহ মানুষের রক্তপাত চলছেই, এবং বিশ্বের নীরবতা কোথা থেকে আসে?
কী ঘটল এবং কারা আটক হলো
ফ্লোটিলার প্রতিনিধিরা সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান, নৌকাগুলোকে ইসরায়েলি নৌবাহিনী আটক করেছে, তাদের উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে ৩৭টি দেশের ২০১ জনেরও বেশি মানুষ আটক হয়েছেন, এতে স্পেনের ৩০, ইতালির ২২, তুরস্কের ২১ ও মালয়েশিয়ার ১২ জন। একইসঙ্গে বেশ কিছু উচ্চপ্রতিষ্ঠিত এ্যাক্টিভিস্ট এবং রাজনীতিবিদ ও অনেকে ছিলেন সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মী, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিশীল গ্রেটা থানবার্গকেও আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন বার্তায় দাবি করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সরকার বলেছে, তারা আগেই ফ্লোটিলাকে সতর্ক করেছিল, যুদ্ধক্ষেত্র নিকটবর্তী এলাকায় প্রবেশ করা বিপজ্জনক এবং বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল তারা নিরাপদ চ্যানেলে সাহায্য পাঠাতে পারে।
অপরদিকে আয়োজকরা দাবি করেন, তাদের ওপর জোরপূর্বক জবরদস্তি চালানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জলরেখায় করে এই আটকাটি অনৈতিক ও আইন বিরুদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরাও মূলত এটিই নিয়ে তর্ক করছেন যে আন্তর্জাতিক জলে নৌযান গুলো আটক করার আইনগত অধিকার ইসরায়লের কী পরিমাণ ছিল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও চাপ বাড়ছে
ফ্লোটিলা আটক হওয়ার পর থেকেই তৎপর পশ্চিমা ও উন্নয়নশীল জাতি থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও স্পেন প্রতিবাদ জানিয়েছে, ইতালির বিভিন্ন ঐতিহাসিক ইউনিয়ন সাধারণ ধর্মঘট ডেকেছে, আর কলম্বিয়া কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ করে ইসরায়েলি কূটনীতিককে তাড়িয়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা এটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছে এবং অনেক শহরে প্রতিবাদ-সমাবেশও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গাজার পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক কালের বিভিন্ন কূটনৈতিক কূটচেষ্টা ও দেশগুলোর পাল্টাপাল্টি সিদ্ধান্তও এই প্রেক্ষাপটকে জটিল করেছে কিছু পশ্চিমা দেশও সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আরও স্বীকৃতি দিয়েছে, যা ইসরায়েল সমর্থক মহলে চাপ তৈরি করছে।
ইসরায়ালের পক্ষ যুক্তি দেয় যে, সামুদ্রিক অবরোধটি নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তারা বলছে, উদ্দেশ্য হলো হামাসকে অস্ত্র সরবরাহ রোধ করা এবং ফ্লোটিলাকে তারা ‘পিআর স্টান্ট’ বা হামাস-সহযোগী ইত্যাদি আখ্যা দিচ্ছে।
আয়োজকরা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে উল্টো সাক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, ফ্লোটিলার পণ্যগুলো চিহ্নিত এবং কার্যত মানবিক ছিল, আর আটক করার কারণ ব্যতীতই এই আক্রমণ।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক জলে নৌযানগুলো আটক করার বিষয়টি কঠোর শর্তাধীন; প্রমাণ ছাড়া যে কোনো শক্ত প্রয়োগকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও সমুদ্র আইনের বিরুদ্ধে বিবেচনা করা যেতে পারে।
কেন ইসরায়েল কে এত ‘বেপরোয়া’ মনে হচ্ছে
নিরাপত্তার রক্ষণশীল ব্যাখ্যা: ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে সামুদ্রিক অবরোধ প্রয়োগ করে আসছে বলে দাবি করে। এটি তাদের নিকটস্থ সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অস্ত্রপ্রবাহ রোধে জরুরি। তাই তারা মনে করে যে কোনো ডিরেক্ট নৌ চালানো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। কিন্তু কার্যতই, বিশাল আর্থ-সামাজিক ও মানবিক অবস্থা ও হতাহতের আকার দেখালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ যুক্তি এখন অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য না।
সাংবাদিকিক ও মানবাধিকার নজর: ফ্লোটিলা–রকম উদ্যোগগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে আন্তর্জাতিক মনোযোগ তৈরির মাধ্যমে অবরোধের মানবিক ফল তুলে ধরা। যখন সেই নজর আন্তর্জাতিক নেতা এবং সাধারণ জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলছে, তখনই অভিযুক্ত রাষ্ট্রটি ‘আরোপিত নিরাপত্তা’ ন্যারেটিভের ওপর আরও কঠোর হয়ে যায় যা ফলত তার অপারেশনের আঙ্গিকও কঠোর হতে পারে।
রাজনৈতিক মিত্রদের জটিলতা: ইসরায়েলের কিছু মিত্র রাষ্ট্র রয়েছে যারা কূটনৈতিকভাবে ও সামরিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে তাকে সমর্থন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে কিছু ইউরোপীয় ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ফিলিস্তিনি স্বীকৃতি বাড়িয়েছে, তাই সমর্থন এখন একটানা নয় ফলে ইসরায়েল কৌশলে আরও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেও তার বিরোধ বেড়ে যাচ্ছে। এই দ্বৈততার কারণে অভ্যন্তরীণভাবে ‘সামরিক-নিরাপত্তা’ বিরাটভাবে বাজানো হচ্ছে।
নিরীহ জীবন ও মানবতার গণহত্যার সামনে আন্তর্জাতিক নীরবতা?
গাজার সাধারণ মানুষের কষ্ট: খাবার-ওষুধের অভাব, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, জল, পরিবহন ব্যাহত ও সশস্ত্র সংঘাতের ভয়, এগুলো মিডিয়ার শিরোনামে প্রায়ই আসে। কিন্তু প্রতিদিনের প্রাণহানির পরিমাণ ও আশ্রয়হীন মানুষের ঘাতক পরিস্থিতি যখন আন্তর্জাতিক আইন, নৈতিকতা ও কূটনীতিতে প্রশ্ন তোলে তখন ‘মানবতার’ শব্দটা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসে। ফ্রন্টলাইন কর্মী ও উদ্ধারকারীরা বলছেন, মানুষের জীবন রক্ষার জন্য তাত্ক্ষণিক এবং নির্বিঘ্ন হিউম্যানিটেরিয়ান রুট দরকার। আর সেটাই ফ্লোটিলার পক্ষে যুক্তি। যদি নৌকাগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে আটক করে দেওয়া হয়, তাহলেই মানুষ-রক্ষা কার্যক্রমকে কঠোরভাবে বাধাগ্রস্ত করা হবে বলে আশঙ্কা মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের।
কৌশলগত প্রশ্ন এ সমস্যা কিভাবে সমাধান হবে?
এই সংকটের সহজ সমাধান নেই, কিন্তু কয়েকটি মৌলিক ধাপ দরকার
স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক তদন্ত: আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল/আইনি তদন্ত পাঠিয়ে যে ঘটেছে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। আটক ও জবরদস্তির ঘটনাগুলোর ভিডিও-প্রমাণ, রেডিও-লগ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান জেগিয়ে আদালত-সামঞ্জস্যের মাধ্যমেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
মানবিক অবরোধের বার্তা: গাজার নাগরিকদের জন্য দ্রুত ও নির্বিঘ্ন হিউম্যানিটেরিয়ান রুট খোলা ও চ্যানেল তৈরি করা, কাগজপত্রের জট কমানো, আন্তর্জাতিক হাই-কমিশনারদের পর্যবেক্ষণে সরবরাহ নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক চাপ: এমন সময় জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদাররা নীতি-চেষ্টা বেশি শাখা দিয়ে প্রয়োগ করার মাধ্যম খুঁজতে পারে, যাতে বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ থাকে।
কতক্ষণ আর কান বন্ধ রাখবে বিশ্ব?
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ঘটনা কেবল একটি নৌযানবাহী সংঘর্ষ নয়। এটি বিশ্ববাজারে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার পরীক্ষা। সক্রিয় নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে এমনকি কিছু রাষ্ট্রও যখন সরাসরি মানবতার পক্ষে সুর তুলছে, তখন প্রশ্নটা আরও তীব্র ও নিরীহ শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষ কি দরিদ্রতার ও বেদনার এক অনন্ত চক্রে জীবন যাপন করবে? বা আমরা কি আজকের এই অভিযানের প্রতিবাদকে এমনভাবে শক্ত করব যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ধরণের অবরোধ ও হিংস্রতাকে ভয় শিখতে না পারে।
অবশেষে ফ্লোটিলার দাবিই স্পষ্ট: গাজার মানুষের জন্য নিরাপদ পথ খুলে দিন। বিচারহীনতা ও অবরোধ বন্ধ করুন। আর বিশ্ব না শোনে, তাহলে শুধু এ ঘটনার তাত্ত্বিক টুকরো খবর থাকবে। কিন্তু যদি বিশ্বের জনগণ, রাজনীতি ও আদালত একসময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে। তাহলে হয়তো গাজার প্রতিদিনের রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব। এই লড়াই এখন কেবল সৈন্য ও নৌবাহিনীর মুখোমুখি নয়, এটা নৈতিকতার, আন্তর্জাতিক আইনের এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতার বিরুদ্ধে লড়াই।
হানিফ খোকন : নিজস্ব মতামত আমার এই জরিপ যতটা সম্ভব প্রফেশনালি এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে করা…
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সপরিবারে যমুনার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বিএনপি…
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেছেন, “নারীদের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক…
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। এই…
বিগত ৩ নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) অনিয়মের তদন্ত রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. অধ্যাপক মুহাম্মদ…
কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্যগুদামে অভিযান চালিয়ে ধান ও চালের মজুদে বড় ধরনের গরমিল পেয়েছে দুর্নীতি দমন…